• বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭  নিউইয়র্ক সময়: ০০:২৯    ঢাকা সময়: ১০:২৯

ফেব্রুয়ারি মাসকে ঘিরে ফুল চাষিদের ব্যস্ততা কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

দেশকণ্ঠ প্রতিবেদন : জারবেরা, গাঁদা, ডালিয়া, গ্লান্ডিওলার, চেরি, ক্যালেনডোলা, স্টার, জিপসি, কাঠমালতিসহ রঙ-বেরঙের নানান ফুলের সমারোহ এখন বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের মাঠে ঘাটে। 
 
পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা ও ভাষা দিবসকে সামনে রেখে এ ইউনিয়নের প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন রাজ্যেও ব্যস্ততা। এক দল ক্ষেত থেকে ফুল তুলছে, আরেক দল আঁটি বাঁধছে। বাড়িগুলোতে মেয়ে-বউরা মালা গাঁথায় ব্যস্ত। তবে এ ব্যস্ততায় ক্লান্তি নেই কারোরই। করোনাভাইরাস মহামারিতে লোকসান গুনে উপার্জন হারানো পরিবারগুলো নতুন বছরে বুনছে নতুন স্বপ্ন।
 
এ বছর প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে ৫ কোটি ৬০ লাখ পিস ১৪-১৫ প্রজাতির ফুল চাষ হয়েছে। যার বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা কৃষি অফিস। এর মধ্যে চেরি, জারবেরা, ডালিয়া, গ্ল্যান্ডিওলার, ক্যালেনডোলা, গাঁদা, জিপসি, কাঠমালতি অন্যতম। 
 
বন্দর উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ফুল চাষের জন্য অন্যতম কলাগাছিয়া ইউনিয়নের দিঘলদী, সাবদী ও মাধবপাশা এলাকা। এ ইউনিয়নে প্রায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১২০-১৪০ জন কৃষক ফুল ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। ইউনিয়ন বাগানে শ্রমিকের কাজ করা, মালা গাঁথা, ফুল পরিবহনসহ বিভিন্নভাবে ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ এখন ফুল চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে।
 
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি প্রতিবছরই কমছে এ ফুল চাষের পরিমাণ। আবাদি জমির অভাবে গত পাঁচ বছরে ফুলের আয় কমেছে প্রায় আড়াই কোটি টাকার। গত ছয় বছরে ফুলের জন্য ব্যবহৃত আবাদি জমি কমেছে প্রায় ৯০-১০০ হেক্টর।
 
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী গত পাঁচ বছর আগেও এ উপজেলায় ১৫০ থেকে ১৬০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হত। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের ফুল চাষ হয়েছিল ১৬০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু এরপরের বছরই আশ্চর্যজনকভাবে গত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে দুইগুণ কমে ৮০ হেক্টর জমিতে নেমে পড়ে ফুল চাষ। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৫ হেক্টর কমে ৭৫ হেক্টর  জমিতে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৭০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয় ৫ কোটি ২০ লাখ পিস।
 
এদিকে গত বছর করোনাভাইরাস মহামারিতে লোকসান গুনতে হলেও এ বছর লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবে বলে আশাবাদী কৃষকেরা।  
 
কলাগাছিয়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বেলি, কাঠমালতী, জারবেরাসহ নানান ফুলের সমারোহ। একই জমিতে ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করা হয়েছে।  
 
ইতোমধ্যেই ফুলের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে বন্দরের কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদি এলাকাটি। একদিকে যেমন যাতায়াতের সুবিধা অন্যদিকে সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় সাবদি এলাকাটিতে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই আছে। এ নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে প্রতিদিনই দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই  ছুটে আসছে এখানে। ফলে গড়ে উঠছে নতুন নতুন ব্যবসায়ও।  নতুন নতুন আয়ের উৎস খুঁজে পাচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ।
 
ফুল চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসকে ঘিরে ফুল চাষের পরিকল্পনা হয়ে থাকে। বছরের অক্টোবর শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির পর্যন্ত এ তিন থেকে চার মাস ফুল চাষিদের জন্য অন্যতম। শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসে ফুল চাষিদের আয়  হয় কোটি কোটি টাকা। এ অঞ্চলে চার তৃতীয়াংশই ঢাকা শাহবাগে। 
 
তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজার এলাকায় প্রতিদিন সকালে বসে ফুলের হাট। সেখানেও স্থানীয় ফুল ব্যবসায়ীদের প্রায় কোটি কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। এর বাইরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও খুচরা দরে দোকানে দোকানে ফুল সাপ্লাই দিয়ে থাকে।
 
সাবদি গ্রামের ফুল ব্যবসায়ী ও উপজেলার ফুল আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাওলাদ হোসেন জানান, "করোনার কারণে গত বছর বিক্রি বাট্টা কমছিল। অনেক ফুল নষ্ট হয়েছে। ফলে অনেকেই এ বছর ফুল চাষে যুক্ত হয়নি। অনেকেই জমি বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে ফুল চাষের আবাদি জমির সংখ্যা কমেছে। আমি নিজেও এ বছর ফুল চাষ করেছি কম।" 
 
"এছাড়া বর্ষার পানিও অনেকটা দেরিতে নেমেছে, শীতের কুয়াশাও ছিল। তবে এ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়েও ফুল উৎপাদন ভালো হয়েছে।  আশা করছি গত বছরের লোকসান কিছুটা হলেও পুষিয়ে উঠতে পারবো।"  
 
তার দাবি, "সরকারিভাবে যথাযথ সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ পেলে ফুলের উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব হত। কারণ করোনাভাইরাস মহামারিতে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ ফুল চাষিরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। যথাযথ সহযোগিতা বাজারজাতকরণ, স্বল্পসুদে ঋণের সুবিধা পেয়ে এসব সমস্যার সমাধান করলে ফুলের চাষ আরো বাড়বে, আগ্রহী হবে মানুষ।"
 
অনেকেই বাড়ির আঙিনায়, ছাদে ফুল চাষ করে আয় করতে পারছে। এছাড়া এখানকার জেলেপাড়া অধিকাংশ পরিবারগুলোরও উপার্জনের অন্যতম উৎস এই ফুল। এ পাড়ার অধিকাংশ পরিবারের মেয়ে-বউরা ফুল কুঁড়িয়ে মালা গাঁথার সাথে যুক্ত। অনেকেই জেলে পেশার পাশাপাশি ফুল বিক্রির কাজ করে।
 
এদিকে ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করে জেলেপাড়ার লক্ষ্মী রানী। 
 
লক্ষ্মী রানী বলেন, "এ সময় একজনের আয়ে কি সংসার চলে। ছেলে মেয়ের পড়াশুনা, তাছাড়া জিনিসপত্রের দাম যে বাড়ছে সেখানে ওই কয়টা রোজগার কিচ্ছু হয় না। তাই এ পথ। সকাল-বিকাল ফুল কুড়াই তারপর মালা গাঁথি। প্রতিদিন তিনশ থেকে চারশ টাকার ফুলের লহর বানাতে পারি।"
 
এক সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মাছ ধরে, নৌকা চালিয়ে উপার্জনকারী পরিবারগুলো এখন আয়ের নতুন উৎস খুঁজে পেয়েছে। 
 
ষাটোর্ধ্ব জেলে হরিদাস এখন মাছ ধরার পাশাপাশি ফুলও বিক্রি করে। বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য ফুলের মুকুট বানিয়ে বিক্রি করে প্রতিদিন আয় করছেন দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা।
 
আবাদি জমি হ্রাসের কারণে হিসেবে উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারি কর্মকর্তা মো. তোফায়েল হোসেন জানান, "অনেক কৃষকই আবাদি জমিগুলো প্লট আকারে বিক্রি করে দিচ্ছে। কেউ ইটভাটা ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু ফুল চাষ নয় অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও কমেছে।"
 
বন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারহানা সুলতানা  জানান, "বন্দর উপজেলায় এ বছর প্রায় ৭০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ প্রজাতির ফুল চাষ হয়েছে। সবকিছু থাকলে গত বছরের যে লোকসান তা কাটিয়ে উঠতে পারবে। অন্যান্য ফসল উৎপাদনের মত এ ফুল উৎপাদনের যথাযথ নজর দিতে পারলে ফুলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। নতুন নতুন জাতের ফুল উৎপাদনও সম্ভব। এখন অধিকাংশই  জমিতে বছরের   তিন মাস ফুল চাষ হয় । তখন বারো মাস করা সম্ভব হবে। কিন্তু সরকারিভাবে ফুল চাষে তেমন কোনো বরাদ্দ নেই। তাই আমরা চাইলেও তাদের  তেমনভাবে সহযোগিতা করতে পারছি না।" 
 
তিনি আরো জানান, "তবে আমরা এ ব্যাপারে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। সবকিছু ঠিক থাকলে নারায়ণগঞ্জ জেলায় শিল্প-কারখানার পাশাপাশি ফুল চাষের মাধ্যমে বৈদেশিক আয় অর্জন সম্ভব হবে।"
 
দেশকণ্ঠ/অআ

AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।