• বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭  নিউইয়র্ক সময়: ০১:০৭    ঢাকা সময়: ১১:০৭

রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু : বিদ্বেষ-বন্দনা বনাম ঐতিহাসিক সত্য

দেশকণ্ঠ প্রতিবেদন : রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এজন্যে তিনি পুলিশি নির্যাতন ও জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। তাঁর এই অবদানকে অনেকে খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন, অনেকে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও আদর্শিক ভিন্নতার কারণে খাটো করে দেখার প্রয়াস চালিয়েছেন, কারও কারও মূল্যায়নে পাওয়া যায় স্ববিরোধিতা, কেউ আবার স্তুতি-বন্দনা করতে গিয়ে করেছেন অতিরঞ্জন; এই বিদ্বেষ-বন্দনা উভয় কারণেই ঘটেছে ইতিহাস-বিকৃতি। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে খণ্ডিত, বিকৃত ও খাটো করে যারা উপস্থাপন করেছেন, তাঁদের কেউ তাঁর সমসাময়িক রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়েও পরবর্তীকালে রাজনীতির মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়েছেন, কেউ আজীবন মুজিব-বিদ্বেষী, কেউ রাজনীতির মাঠের সরাসরি প্রতিযোগী, কেউ কেউ সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ লালনকারী, আবার কেউ সুযোগ-সন্ধানী; ফলে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান বিষয়ে তাঁদের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ কখনো একদেশদর্শিতা দ্বারা আবার কখনো ঈর্ষা, অন্ধ-বিদ্বেষ ও স্তুতি-বন্দনা দ্বারা আচ্ছন্ন। তাঁদের সেসব তথ্য ও বক্তব্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, সমসাময়িক পত্রপত্রিকার বিবরণ, ভাষা-আন্দোলনের নানা দলিলপত্র, ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতিচারণ প্রভৃতির আলোকে আলোকে যাচাই করা হলো।
 
 
অলি আহাদ, আবদুল মতিন, আহমদ রফিক ও বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্য যাচাই
 
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খণ্ডিত ও বিকৃত করতে যাঁরা লেখনী ধারণ করেছেন তাঁদের মধ্যে অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, মোহাম্মদ সুলতান, আবদুল মতিন, আহমদ রফিক, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মোহাম্মদ তোয়াহা এবং বদরুদ্দীন উমর ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের আশ্রয় নিয়ে ইতিহাসের সত্যকে আড়ালের চেষ্টা করেছেন। বদরুদ্দীন উমর ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভায় শেখ মুজিবের সভাপতিত্ব করার ঘটনাটি ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। ঐ সভায় তাঁর সভাপতিত্ব করা বিষয়ে বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন : ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ সভার নির্ধারিত সময়ের কিছু পূর্বেই বেলা দেড়টার সময় শেখ মুজিবুর রহমান কালো শেরওয়ানী এবং জিন্নাহ টুপী পরিহিত হয়ে একটি হাতলবিহীন চেয়ারে সভাপতির আসন অধিকার করে বসেন। সেই সভায় তাঁর সভাপতিত্ব করার কোন কথা ছিলো না কারণ ঢাকার তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে তাঁর ভূমিকা ছিলো নিতান্ত নগণ্য। কিন্তু এ সত্ত্বেও তিনি নিজেই সেই সভায় সভাপতিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সভাপতির চেয়ার দখল করেন।’ (পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৯৬)
 
 যাঁর সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে বদরুদ্দীন উমর এ যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি হলেন মোহাম্মদ তোয়াহা, যিনি আজীবন ছিলেন অতিমাত্রায় মুজিব-বিদ্বেষী। তোয়াহার সমালোচনায় শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অবদান অস্বীকারের প্রবণতা তো ছিলই, তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে তোয়াহা ও তাঁর দল ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে অভিহিত করেছে। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভায় তাঁর সভাপতিত্ব করা প্রসঙ্গে তোয়াহা লিখেছেন : ‘সেদিন (১৬ই মার্চ) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মিটিং হওয়ার কথা ছিল। সেটিতে কথা ছিল আমার সভাপতিত্ব করার। নির্ধারিত সময়ের একটু আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি শেখ মুজিবুর রহমান একটা কালো শেরওয়ানী এবং জিন্নাহ টুপী পরে একটা হাতল বিহীন কাঠের চেয়ারে বসে আছে। তাকে ঐভাবে সভাপতির চেয়ারে বসে থাকতে দেখে খুবই আশ্চর্য হলাম। যাই হোক আমি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। সভাস্থলে তখন আন্দাজ ১৫০ জন লোক ছিলো। এই সময় হঠাৎ করে মুজিব উঠে দাঁড়িয়ে একটা বক্তৃতা শুরু করে দিল। বক্তৃতার সারমর্ম কিছুই ছিল না। ছোট বক্তৃতার পর সে অন্য কাউকে বক্তৃতার সুযোগ না দিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘চলো চলো এ্যাসেমব্লি চলো।’ (উদ্ধৃত, বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল-২, পৃ. ২৬৪-২৬৬)
 
বদরুদ্দীন উমর ও মোহাম্মদ তোয়াহার এ বক্তব্যে ১৬ মার্চের সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্ব করার বিষয় ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা ঐদিনের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ঐ সভায় উপস্থিত তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্য নেতৃবৃন্দের বিবরণের সঙ্গে মোহাম্মদ তোয়াহা এবং বদরুদ্দীন উমরের বিবরণের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। মোহাম্মদ তোয়াহার বিবরণ অসংলগ্ন, তাতে তারিখ ও ঘটনার যেমন অসঙ্গতি রয়েছে তেমনি একই ঘটনা একেক সময় একেকভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতাও লক্ষণীয়। তিনি ঐ দিনের সভা শুরুর কথা বলেছেন ১১টায়, কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘বেলা দেড়টায় সভা শুরু হলো’; তোয়াহা এ সভায় নিজের সভাপতি নির্ধারিত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন, যা আর কারো লেখায় উল্লেখ নেই; তিনি বলেছেন, নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে করা চুক্তি বিষয়ে শেখ মুজিব কিছু জানতো না, কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সকল নেতাই বলেছেন চুক্তির খসড়া কারাবন্দি শেখ মুজিবসহ অন্য নেতৃবৃন্দের অনুমোদন নেওয়া হয়; তিনি বলেছেন, কাউকে কথা বলার সুযোগ দেয়নি মুজিব, অন্যরা বলেছেন অনেকেই সেদিন বক্তৃতা দিয়েছে; তোয়াহা বলেছেন, শেখ মুজিব পার্লামেন্টারি পার্টির লোকজনের প্ররোচনায় ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেছেন, এ কথা আর কেউ বলেননি; তিনি বলেছেন, শেখ মুজিব জিন্নাহ টুপি ও শেরওয়ানী পরে ঐ সভায় একটি হাতলবিহীন চেয়ারে বসে সভাপতিত্ব করেন, অন্য কারও লেখায় বা স্মৃতিচারণে এ বিবরণ আসেনি; তিনি বলেছেন, ঢাকার ছাত্রসমাজে শেখ মুজিবের পরিচিতি ছিল নগণ্য, কিন্তু সমসাময়িক ইতিহাস তা বলে না। এসব তথ্যই প্রমাণ করে ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় শেখ মুজিবের সভাপতিত্ব প্রসঙ্গে মোহাম্মদ তোয়াহার বক্তব্য তথ্যপূর্ণ ও ইতিহাসের বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে বদরুদ্দীন উমর যেহেতু মোহাম্মদ তোয়াহার বিবরণকেই সাক্ষ্য মেনেছেন সেজন্য তাঁর বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়। ঐ দিনের ঘটনাপ্রবাহ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, শওকত আলী, গাজীউল হক প্রমুখের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বদরুদ্দীন উমরের বিবরণ অসার এবং উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে হয়।
 
মোহাম্মদ তোয়াহা ও বদরুদ্দীন উমর কথিত, শেখ মুজিবুর রহমান ‘নিজেই সেই সভায় সভাপতিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন’ এ কথাটি ঠিক নয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ তোয়াহা কোথাও এ কথা বলেননি। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতেও এ ধরনের কথা উল্লেখ নেই। উপস্থিত ছাত্রদের সম্মতিতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দীন আহমদ সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিব নিজে বলেছেন : ‘১৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে সভার সময় কে সভাপতিত্ব করবে তাই নিয়ে একটা বিতর্ক হয়। কেউ আমার নাম, কেউ শামসুল হকের নাম, কেউ বা আবার কমিটি অব অ্যাকশনের কারো কারো নাম প্রস্তাব করলো। কিন্তু সভা আরম্ভ করার পর নঈমুদ্দীন আমার নাম প্রস্তাব করে এবং সেখানে কোনো আপত্তি ওঠে না।’ (‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ’, ভালোবাসি মাতৃভাষা, পৃ. ৩)
 
বদরুদ্দীন উমর ও মোহাম্মদ তোয়াহা বলেছেন, ‘ঢাকার তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে তাঁর ভূমিকা ছিলো নিতান্ত নগণ্য।’ তাঁদের এ বক্তব্যও যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন এবং এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া ও ১১ মার্চের ধর্মঘটে শেখ মুজিবের অগ্রণী ভূমিকা প্রমাণ করে তখনকার ছাত্র আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বে পূর্ববঙ্গের ছাত্ররাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। আর তা না হলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হতো না যে, He took very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan, and made propoganda at Dacca for general strike on 11.3.48. on this issue. On 11.3.48 the subject was arrested fo violating orders under section 144 Cr. P.C. (Secret  Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Volume-1 (1948-19750),  p. 319
 
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সচিবালয়ের গেটে মাটিতে শুয়ে ছাত্রদের অবস্থান ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সচিবালয়ের গেটে মাটিতে শুয়ে ছাত্রদের অবস্থান ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
কাজেই মোহাম্মদ তোয়াহা এবং বদরুদ্দীন উমর ১৬ মার্চে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভার বিবরণে শেখ মুজিবের যে চিত্র অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন, তা সমর্থন করা যায় না। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চের ঘটনা সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ বলে গ্রহণ করা যায়। তিনি লিখেছেন : ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেলা দেড়টায় সভা শুরু হলো। মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সংশোধনীগুলি গৃহীত হলো। যদিও সংগ্রাম কমিটির কোনো কর্মসূচি ছিল না, তবু এসেম্বলি হাউস অভিমুখে ছাত্রদের একটা বিক্ষোভ মিছিল পরিচালিত হলো এবং সরকারি দলের এমএলএদের নিন্দা করে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করল। এএসই মেইন হোস্টেলের একটা রুমে মিলিত হলাম। পাঁচটা পর্যন্ত সেখানে থাকলাম। পরে ছাত্রদের এমএলএদের ‘ধর ধর’ শব্দে রুম থেকে বের হলাম। এর ফলে এসেম্বলি হল থেকে সরকারি দলের অনেক এমএলএ বের হলো না। ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় মি. গফুর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রহমতুল্লাহর নেতৃত্বে একদল পুলিশ এসে ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ, ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল। তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরেও গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল। লাঠিচার্জে ১৯ জন মারাত্মকভাবে আহত হলো। শওকত তাদের অন্যতম। (তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-১৯৪৮, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৩১)
 
মোহাম্মদ তোয়াহা এবং বদরুদ্দীন উমর ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, একইভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে তাঁর অবদান-প্রসঙ্গে যুক্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আহমদ রফিক এবং মোহাম্মদ সুলতানও ঢালাওভাবে বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁরা বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে তাঁর যুক্ত থাকা এবং কারাগার থেকে ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টিকে ইতিহাসের ‘কল্পকাহিনী’, ‘ইতিহাস বিকৃত করার অনাচারী প্রবণতা’, ‘মনগড়া বক্তব্য’ প্রভৃতি বলে অভিহিত করেছেন। অলি আহাদ তাঁর জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ’৭৫ গ্রন্থে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কারাগারে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে নিজের সাক্ষাৎ করা প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও, সার্বিকভাবে বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে তাঁর অবদানকে অস্বীকার করে লিখেছেন : ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি কারামুক্তি পেলেন। কিন্তু ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ঢাকায় এলেন না নেতৃত্ব দিতে। বিদ্রোহের অনলে ঝাপও দিলেন না। এমন কি খুনী শাসক নূরুল আমীনের বিরুদ্ধে ৫ই মার্চ দেশব্যাপী যে হরতালের ডাক দেওয়া হয় শেখ মুজিব তাতে অংশগ্রহণ করে মারমুখো জনতাকে নেতৃত্ব দিতে ঢাকায় আসেন নাই। তারপরও মুখপোড়া আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় দালাল চামচারা বলে ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবর নাকি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ধিক তাদেরকে।’ (জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ’৭৫, পৃ. ১৪৭) প্রায় একই ধরনের মন্তব্য আবদুল মতিন, আহমদ রফিক এবং বদরুদ্দীন উমরের লেখাতেও পাওয়া যায়। আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য গ্রন্থের ৪র্থ অধ্যায়ের ‘ইতিহাস নিয়ে কল্পকাহিনী’ অংশে লিখেছেন :
 
‘বলা বাহুল্য তাদের মুক্তির জন্য রাজনৈতিক চাপ, ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা এবং সর্বোপরি তাদের অনশন ধর্মঘটের কারণে সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি মহিউদ্দিন আহমদকে ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। আন্দোলন তখনও চলছে। কিন্তু সদ্যমুক্ত শেখ মুজিব সাহেব তখন ঢাকায় এসে আন্দোলনে যোগ না দিয়ে সম্ভবত স্বাস্থ্যগত কারণে তার গ্রামের বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন (আজাদ, ৮-২-৫২)। শুধু তাই নয়, দুই মাস পর নতুন করে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সভায় শেখ সাহেবের বক্তব্য থেকেও এই ঘটনা সঠিক মনে হয়। তিনি বলেন : ‘দীর্ঘ আড়াই বছর কারাবাসের পর আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা যখন ভাষা সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, আমি তখন কারাগারে অনশনরত।’ এমনি একাধিক তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, একুশের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অথচ দীর্ঘকাল পর বৃথাই একুশের আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে ‘মিথ’ তৈরির চেষ্টা চলছে, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, সে চেষ্টা এখনো চলছে এবং এজন্য দায়ী কয়েকজন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি। এতে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। (ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য, সাহিত্য প্রকাশ, তৃতীয় সংস্করণ, ২০০৫; পৃ. ৮৫-৮৬)
 
বদরুদ্দীন উমর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (তৃতীয় খণ্ড) গ্রন্থে ১৯৫২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে শেখ মুজিবের একটি চিঠি আসার কথা উল্লেখ করলেও পরবর্তীকালে দেশ পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় ভাষা-আন্দোলনে তাঁর অবদান অস্বীকার করে বলেছেন : ‘শেখ মুজিব ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, যে সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে বিপুল সংখ্যায় গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অনেক সদস্য আত্মগোপন করে আছেন। এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি লাভ থেকেই প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন ভাষা আন্দোলনে তারও কোন ভূমিকা ছিল না এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মুক্তি দেওয়াটা সরকার নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিপজ্জনক কিছুই মনে করেনি।’ (দেশ, কলকাতা : ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮)
 
অলি আহাদ, আবদুল মতিন, আহমদ রফিক ও বদরুদ্দীন উমরের উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে তথ্যবিভ্রাট যেমন আছে তেমনি আছে খণ্ডিত তথ্য। তাঁরা ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকারে যা বলতে চেয়েছেন তা হলো—১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে ঢাকায় এসে ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত হননি। তাঁদের দাবি ভাষা-আন্দোলন ‘তখনও চলছে’, তাই ঐ সময় তাঁর মুক্তি পাওয়াটা প্রমাণ করে আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল না। আরও বলেছেন, কারাগার থেকে বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির তুঙ্গ মুহূর্তের আন্দোলন বিষয়ে তার নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টি যথার্থ নয়। এছাড়া কারাগার থেকে মুক্তির ২ মাস পর ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তব্য দেন, তার ফলে তাঁরা ৫২-র ভাষা-আন্দোলনে তাঁর যুক্ত না থাকার ‘ঘটনা সঠিক’ বলে মনে করেছেন। তাঁদের এ জাতীয় বক্তব্য খণ্ডন করার পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ১৯৫২ সালের পুরো ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে তাঁদের এসব বক্তব্য অযৌক্তিক, খণ্ডিত, একপেশে, স্ববিরোধিতাপূর্ণ এবং ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস বলে মনে হয়। তাঁদের বক্তব্য ও যুক্তি কতটা ভিত্তিহীন তা এখানে তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা হলো।
 
শেখ মুজিবরের অনশন ধর্মঘট
প্রথমত : অলি আহাদ, আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান ২৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ তথ্য ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তির আদেশ পান ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আর মুক্তি লাভ করেন ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২।
 
দ্বিতীয়ত : তাঁরা বলেছেন, মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিব কেন ঢাকায় এসে ভাষা-আন্দোলনে যোগ দিলেন না। কিন্তু ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তো ভাষা-আন্দোলনের কর্মসূচি চলমানই ছিল না (যদিও আহমদ রফিক ও আবদুল মতিন বলেছেন, ‘আন্দোলন তখনও চলছে)। ঐ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে গ্রেপ্তার হন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবুল হাশিম, খয়রাত হোসেন, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, মনোরঞ্জন ধর এবং গোবিন্দলাল ব্যানার্জী। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, ড. পিসি চক্রবর্তী এবং জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক অজিত কুমার গুহকে। ১৯৫২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় ‘২৬. ২. ৫২ তারিখ থেকে সাধারণ ধর্মঘট প্রত্যাহার’ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরের সর্বত্র স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে এ বিবরণ উল্লেখ আছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখে তিনি লিখেছেন : ‘সেন্ট্রাল কমিটি অব অ্যাকশন ও সিভিল লিবার্টিস কো-অর্ডিনেটিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকে শহরের সর্বত্র স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হলো। লাগাতার ৫দিন ধর্মঘট চলার পর রিকশাওয়ালাদের মতো দরিদ্র জনগণ তাদের বিরাম দেওয়ার জন্য আমাদের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করল।’ (তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৫২, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৫৪)
 
২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ হলের হাউস-টিউটর ড. মফিজউদ্দিন আহমদসহ ৩০ জন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে এবং মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণের শহিদ মিনার ভেঙে ফেলে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি এক গেজেট প্রকাশ করে কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নেওয়াজ খান, শামসুল হক, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, সৈয়দ এম নূরুল আলম, আজিজ আহমদ, আবদুল আওয়াল ও মোহাম্মদ তোয়াহাকে এক মাসের মধ্যে নিজ স্ব-স্ব জেলা প্রশাসকের কাছে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। এমন পরিস্থিতিতে এ সময় ভাষা-আন্দোলনের নতুন কোনো কর্মসূচি ছিল না, নেতাদের প্রায় সবাই গাঢাকা দিয়েছেন, কাউকেই ঐ সময় রাজপথে দেখা যায়নি। শেখ মুজিবের মুক্তির সপ্তাহ খানেক পর, অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ৭ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য গোপীনগরের এক বাড়িতে গোপন বৈঠক করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন।
 
তৃতীয়ত : তাঁরা বলেছেন, যখন সকলকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তখন শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া প্রমাণ করে ভাষা আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল না। তাঁরা এও বলতে চেয়েছেন যে, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া আন্দোলনের জন্য বিপজ্জনক মনে করেনি সরকার। কিন্তু একটু তথ্য-প্রমাণ হাজির করলেই দেখা যায়, তাঁদের এ বক্তব্য যুক্তিহীন, স্ববিরোধিতাপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর। আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক নিজেরাই শেখ মুজিবের মুক্তির পেছনে ‘রাজনৈতিক চাপ’, ‘ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা’ এবং ‘সর্বোপরি তাদের অনশন ধর্মঘটের’ কথা উল্লেখ করেছেন। বাস্তবেই শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশেই আন্দোলন হয়েছে। তাছাড়া টানা এক সপ্তাহের বেশি অনশনে তাঁর শারীরিক অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয় পড়ে। ফলে বাধ্য হয়েই সরকার শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমেদকে মুক্তি দেয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পূর্ব থেকেই অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করে। তাছাড়া সরকার শেখ মুজিবকে মুক্তি দিলেও তাঁর ওপর ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশি নজরদারি। অবস্থা এমন ছিল যে, কারাগার থেকে মুক্ত হলেও প্রকারান্তরে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গৃহবন্দি। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনসূত্রে এ তথ্য জানা যায়। ১৯৫২ সালের ১ মার্চ পূর্ববঙ্গ পুলিশের আইজি এ কে এম হাফিজুদ্দীন এক টেলিগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানকে কঠোর নজরদারিতে রাখার জন্য ফরিদপুরের পুলিশকে নিম্নোক্ত নির্দেশ দেন : Please keep continuous on Sk. Mujibur Rahman and if he indulges again in prejudicial activities he should be arrested. তাছাড়া শেখ মুজিবুর রহমান যখন কিছুটা সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফেরেন তখনও তাঁর উপর কঠোর পুলিশী এবং গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হয়। ১৮ এপ্রিল, ১৯৫২ তারিখের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয় : It appears from a report of D. I. O. (Gopalganj) that Sk. Mujibar Rahman (AML-Ex-Security Prisoner) S/O Lutfar Rahman of Tungipara, Gopalganj, faridpur was to start for Dacca on 16.4.52. Arrangements were however made to shadow him up to dacca. ফলে বদরুদ্দীন উমর, অলি আহাদ এবং মোহাম্মদ তোয়াহাসহ অন্যরা শেখ মুজিবের মুক্তিদান প্রসঙ্গে তাঁর ভাষা-আন্দোলনে সম্পৃক্ততা না থাকা বিষয়ে যে কল্পকাহিনি ফেঁদেছেন, তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কাজেই ঐ সময় শেখ মুজিবের মুক্তিদান-প্রসঙ্গ তুলে তাঁরা তাঁর ভাষা-আন্দোলনে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার যে সবক দিয়েছেন, তা ধোপে টেকে না।
 
চতুর্থত : তাঁরা বলার চেষ্টা করেছেন, ফরিদপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় এবং কারামুক্ত হয়ে শেখ মুজিব ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে নীরব ছিলেন। তাঁদের এ ধরনের ভাবনাও যথার্থ নয়। কারণ সমসাময়িক পত্রপত্রিকা, শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং আনিসুজ্জামানের স্মৃতিকথা ‘কাল নিরবধি’ থেকে জানা যায়, ঢাকায় গুলিচালনা ও ধরপাকড়ের সংবাদ শুনে শেখ মুজিবুর রহমান অতিশয় মর্মাহত হন, তাঁদের অনশনের দাবির সঙ্গে একুশের গুলিচালনার ঘটনার প্রতিবাদ যুক্ত করেন এবং মুক্ত হয়ে শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন একুশের গুলিচালনার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে তিনি দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ১৯৫২ সালের ৫ই মার্চ এবং ৩১ মার্চ ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। বাস্তবেই কিছুটা সুস্থ হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন ও কারাবন্দিদের মুক্তির দাবি করেন। তিনি করাচী গিয়ে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বন্দিদের মুক্তির দাবি জানান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বিবৃতি প্রদান করান। সেখানে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর করেন।
 
পঞ্চমত : আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক ১৯৫২ সালের ২৭ এপ্রিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সম্মেলনে শেখ মুজিব প্রদত্ত বক্তব্য খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করে লিখেছেন : ‘দুই মাস পর নতুন করে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সভায় শেখ সাহেবের বক্তৃতা থেকেও এই ঘটনা (ভাষা-আন্দোলনে সম্পৃক্ততা না থাকা) সঠিক বলে মনে হয়।’ তাঁরা শেখ মুজিবের ভাষণের যে অংশটুকু দৈনিক আজাদ পত্রিকার সংবাদ থেকে তুলে ধরেছেন, তা হলো : ‘দীর্ঘ আড়াই বছর কারাবাসের পর আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা যখন ভাষা সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, আমি তখন কারাগারে অনশনরত।’ বস্তুতপক্ষে, শেখ মুজিব ঐ সম্মেলনে এর বাইরে আরও অনেক কথা বলেছিলেন, যা ইত্তেফাক, আজাদ, সৈনিকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি ভাষা-আন্দোলনকে জনগণের ন্যায্য দাবি বলে অভিহিত করেন। আজাদ পত্রিকায় তাঁর বক্তৃতার বাকী অংশে যা বলা হয়েছে, তা হলো : ‘আপনারা সংঘবদ্ধ হোন, মুসলিম লীগের মুখোশ খুলে ফেলুন। এই মুসলিম লীগের অনুগ্রাহে মওলানা ভাসানী, অন্ধ আবুল হাশেম ও অন্যান্য কর্মীরা আজ কারাগারে। আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না, বাঁচতে চাই, লেখাপড়া করতে চাই; ভাষা চাই’। তিনি রাষ্ট্রভাষার উপর গণভোট দাবি করে বলেন, ‘মুসলিম লীগ সরকার আর মর্নিং নিউজ গোষ্ঠী ছাড়া প্রত্যেকেই বাংলা ভাষা চায়।’ এদিনের বক্তৃতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়ে বিবৃতি প্রদানের বিষয়টিকে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। কাজেই, ‘আপনারা যখন ভাষা সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, আমি তখন কারাগারে অনশনরত’, এ উক্তি থেকেই বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান খারিজ করে দেওয়া যায় না। ইতিহাসের সত্য হলো, শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থাকলেও কারাগারে বসে ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে এ আন্দোলনকে সফল করে তুলেছেন, যা ছাত্রনেতাদের বক্তব্য ও আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি থেকে প্রমাণ করা যায়। তিনি সরকারের জন্য কতটা আতঙ্কের ছিলেন, তা তাঁর উপর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কঠোর নজরদারি থেকেই উপলব্ধি করা যায়।
 
ষষ্ঠত : জেলখানা থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক চিরকুট পাঠিয়ে নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টিকে বদরুদ্দীন প্রথম দিকে পরোক্ষভাবে মেনে নিলেও, পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখায় তা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন : ‘যিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পায়খানার গবাক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন তাঁকে কীভাবে সেই সংকটজনক সময়ে সরকার মুক্তি প্রদান করলো? এই রাজনৈতিক মারফতী বা অধ্যাত্মবাদের মহিমা বোঝা আমাদের মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের কর্ম নয়।’ (দেশ, কলকাতা : ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮) বদরুদ্দীন উমরের এ মন্তব্য বালখিল্যপনা বৈ আর কিছু নয়। যেখানে ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতৃবৃন্দ, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ বলেছেন ভাষা-আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান, কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদসহ অনেক ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সাক্ষাৎ করেছেন এবং আন্দোলনে নির্দেশনা দিয়েছেন; সেখানে বদরুদ্দীন উমর স্বভাবসুলভ ভাষায় যে উক্তি করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে জেলখানা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়ে বদরুদ্দীন উমরের প্রত্যেকটি মত বিভিন্ন যুক্তি দ্বারা খণ্ডন করে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন : ‘উমরকে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না। বায়ান্ন সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারেকাছেও তিনি ছিলেন না। ... একটি আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলে পদে পদে যে ভুল হয়, ১৪৪ ধারা সম্পর্কে উমরের বালখিল্য উক্তিই তার প্রমাণ।’ অলি আহাদ লিখেছেন : ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫০ সালের ১লা জানুয়ারী হইতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। চিকিৎসার কারণে সরকার তাঁহাকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযোগ গ্রহণ করিয়া আমরা তাঁহার সহিত হাসপাতালেই কয়েক দফা দেখা করি। তিনি ও নিরাপত্তা বন্দী মহিউদ্দিন আহমদ ১৬ই ফেব্রুয়ারী হইতে মুক্তির দাবীতে অনশন ধর্মঘট করিবেন, সেই কথা শেখ সাহেবই আমাদিগকে জানাইয়াছিলেন। ... ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে শেখ মুজিবর রহমানকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয় এবং এই ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে ফরিদপুর যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে নারায়ণগঞ্জ নেতৃবৃন্দের সহিত শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ ঘটে।’ (জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ’৭৫, পৃ. ১৩৬-১৩৭)
 
এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, আহমদ রফিক, বদরুদ্দীন উমরসহ যাঁরা ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদানকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, তাঁদের বক্তব্য ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই করলে যুক্তিগ্রাহ্য ও যথাযথ ঐতিহাসিক সত্য বলে মনে হয় না।
 
মোহাম্মদ তোয়াহা ও মোহাম্মদ সুলতানের বক্তব্য যাচাই
 
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যাঁরা অস্বীকার করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারণ করতে হয় মোহাম্মদ তোয়াহার নাম, যাঁকে ‘ঢাকার উত্তপ্ত রাজপথে ২১ ফেব্রুয়ারির রাত হতে আর দেখা যায় নাই’। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্ব করা প্রসঙ্গে মোহাম্মদ তোয়াহা যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, সে প্রসঙ্গে আগেই আলোকপাত করা হয়েছে। এবার তাঁর অন্য বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা যাক। মোহাম্মদ তোয়াহা বলেছেন : ‘এর (১৬ মার্চ আমতলার সভা) পূর্বে নাজিমুদ্দীনের সাথে আমাদের একটা agreement হয়েছিলো, কিন্তু মুজিব সে এর কোনো কথা জানতো না।’ মোহাম্মদ তোয়াহার এ বক্তব্য ঠিক নয়, কারণ ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের যে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো, তার খসড়া কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দকে দেখিয়ে তাঁদের অনুমোদন নেওয়া হয়। মোহাম্মদ তোয়াহা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা-আন্দোলনে অবদান নিয়ে আরেকটি আষাঢ়ে গল্প সৃষ্টি করেছেন, তা হলো : ‘একদিন আমি এবং তাজউদ্দীন আইন পরিষদের সদস্য মোঃ তোফাজ্জল আলীর বাসায় যাই। তিনি আমাদের দেখেই দূর থেকে চীৎকার করে বলে উঠলেন—‘আরে এসো, এসো, তোমাদের খবর আছে।’ আমরা বুঝতে পারলাম না। এ ‘খবর আছে’ কথার অর্থ কি? আমরা গিয়েছিলাম প্রাদেশিক পরিষদ থেকে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট যে সুপারিশ পাঠানোর কথা ছিল, সে বিষয়ে জানার জন্য। সে বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করলে তিনি যেন হেলা করেই বললেন, ‘আরে, ওসব হয়ে যাবে। এখন কথা শুনো, Perhaps you are getting two ministers and one Ambassador. মুজিব তোমাদের কিছু বলেনি।’ আমরা অবাক হয়ে গেলাম। তোফাজ্জল আলী সাহেবের সাথে আরো কিছুক্ষণ আলাপ হলো। আলাপের পর আমাদের বুঝতে বাকি রইল না যে, শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনের প্রাণশক্তিকে MLA-দের পদ এবং ক্ষমতা লাভের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন। ... তখন আইন পরিষদের ভিতরে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থক MLA-দের একটি গ্রুপ ছিল। এঁদের মধ্যে ছিলেন মোঃ তোফাজ্জল আলী (কুমিল্লা), মফিজ উদ্দীন (কুমিল্লা), আনোয়ারা বেগম, খান সাহেব ওসমান আলী (নারায়ণগঞ্জ), মোহাম্মদ আলী (বগুড়া প্রমুখ)। শেখ মুজিব এঁদের কাছে আনাগোনা করতেন এবং প্রচার করে বেড়াতেন যে, ইউনিভার্সিটিতে যেসব আন্দোলন হচ্ছে তা তিনি এবং তাঁর সমর্থকেরাই পরিচালনা করছেন। সুতরাং, তাঁদের মধ্য থেকে (সোহ??

AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।