• শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ২৪ বৈশাখ ১৪২৮  নিউইয়র্ক সময়: ০৬:২৯    ঢাকা সময়: ১৬:২৯

অতিথি কলাম : অচেনা মানুষের কথা

দুবাই আরব আমিরাতের অন্যতম একটি প্রদেশ। পারস্য উপসাগরের নৈর্সগিকতা যাকে ছুঁয়েছে আপন মাহমায়। সেই সুদূর দুবাই থেকে নিজ কাজের খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতার কথা লিখছেন দেশকণ্ঠের অতিথি লেখক ডা. কাজী স্বর্ণ রেখা। যিনি ব্রত মেনেছেন মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়ে কর্মযজ্ঞকে।  গভীরভাবে ভালোবাসে বাংলাদেশকে। দেশের মানুষকে অবগত করতে তার এই অতিথি কলাম—  


এক দম্পতি এলো  ৩০ এপ্রিল আমার অফিসে। তাদের দুটো সন্তান আছে। একটি ছেলে, একটি  মেয়ে, তাদের বয়স ১৪ আর ১২, দম্পতি আরও একটি সন্তান চান। তাদের ফাইলটা দেখে জানলাম  কানাডার  নাগরিক।

ওই দম্পতি আমার রুমে প্রবেশের সাথে সাথে আমি জানতে চাইলাম তাদের এয়ারপোর্ট  পি সি আর রিপোর্ট (করোনা)  রিসেপশনিস্ট দেখেছে কিনা? তারা না বলতেই আমি একটু শংকিত হয়ে ম্যানেজারকে রুমে ডেকে জানতে চাইলাম কেনো এরকম হলো। আমি এই কারণে একটু বেশি তৎপর হলাম  ৩ সপ্তাহ আগে একটি  দেশের থেকে একজন  মহিলা এসেছিলেন (যেখানে করনার হার অত্যন্ত বেশি) আইভিএফ  চিকিৎসার জন্য, তিনি আমাদের  হাসপাতালের ফর্মে লিখেছেন তার  এবং তার স্বামীর  করোনা নেই, এয়ারপোর্টর রিপোর্ট  নেগাটিভ। কিন্তু রিপোর্ট জমা করেন নাই, রিসেপশনিস্ট দেখে নাই, কারণ সেল্ফ ডিক্ললারেশন ছিল । তাই কর্তৃপক্ষ সম্মান করেছিল।

তাদের চিকিৎসা শুরু করে যখন জানলাম তার স্বামী হোটেলে আছেন আর জ্ব র আছে, বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম। আর বললাম আশাকরি তার স্বামীর এয়ারপোর্টের রিপোর্ট নেগাটিভ, তিনি মাথা  নেড়ে  একই কথা বললেন। আমি দেখতে চাইলাম। বললেন  আমাদেরকে ই-মেইল করবে, আমি ভেবেনিলাম সবঠিক আছে হয়তোবা। আমার কাজ শেষ করে (চিকিৎসা সংক্রান্ত) তাকে  অপারেশনের তারিখ দিয়ে আবার কভিড টেস্ট করতে দিলাম সেই দিনই। পরদিন যখন আমি হাসপাতালে ঢুকেছি, নার্স  ছুটে  এসে তার রিপোর্ট দেখাল কভিড পজিটিভ এসেছে। একটু ভয় হলো মনে মনে, তার সাথে ৪৫-৫০ মিনিট  কাটিয়েছি। ম্যানেজারকে আর  কনস্যালটেন্ট বসকে জানালাম বিষয়টি। এরপর বাসাতে আলাদা থাকলাম। ৩  দিন পর নিজের টেস্টও করলাম। আর পেসেন্টকে  ফোন  করে জানালাম তার রিপোর্ট। সে নির্বিকার। তাকে আবারও  জিজ্ঞেস করলাম তাদের এয়ারপোর্ট রিপোর্ট কি ছিল। একি উত্তর ছিলো, ই-মেইল করে সাদা কাগজ এ টাইপ  করে পাঠিয়েছে আমাদের কাছে যে তারা নেগেটিভ। কোন স্টাম্প নেই, এয়ারপোর্টের রিপোর্ট  অন্যরকম হয়, সেরকম নয়।  এই ছিলো অন্যরকম বিরল অভিজ্ঞতা। কানাডার  এই দম্পতিকে দেখে আমার মনে সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু সত্য এটাই  মানুষ  তার  দেশ, জাতি, পারিবারিক শিক্ষা  বিভেদে ভিন্ন হয়। আমার  কাজের জায়গায় বসে  কিছুটা বুঝতে পারার সৌভাগ্য হয়েছে। সততার সাথে চলবে এরকম মানুষগুলো  কেমন হতে পারে, কারা চালাকি করবে না, কারা তাদের মুল্যবোধ  ধরে রাখবে।

কানাডার পাসপোর্ট  আছে এই দম্পতির। তবে জন্মভুমি আফ্রিকার সবচে লম্বা  সমুদ্রতীর  দেশ সোমালিয়া। দেশটি  আগে  ইতালি  এবং ব্রিটিশ কলোনি ছিল, অর্থনৈতিকভাবে তেমন উন্নত নয়। এখানে মুসলিম আছে নিরানব্বই ভাগ।  কথায় কথায় জানলাম এই দম্পতি কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন ২০ বছর হলো। কিন্তু তারা বতর্মানে বেশ কয়েকবছর থাকেন সোমালিয়াতে। এরকম উন্নত দেশ ছেড়ে কেন তারা নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করল, তার কারণ জিজ্ঞেস করাতে তারা জানালো বেশ কিছু কারণ আছে। তবে তার মধ্যে  দুটো কারণ তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। খুব দুঃখের সাথে জানালেন ছেলেমেয়ে  আর তাদের সাথে থাকেনা। পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে। বাচ্চাদের অনুভূতির দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে। ওখানকার সংস্কৃতিটাই ওরকম। সেখানে স্কুল থেকেই ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর এতটাই ধারণা পায় বাচ্চারা, যে  তারা নিজেদের মধ্যে জগত খুঁজে নেয়। অচেনা হতে শুরু করে আপনদের থেকে।  এসব কিছু ওই দম্পতির জন্য মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। অর্থনৈতিক  ও সামগ্রিক উন্নতির কাছে তারা আর পরাজিত হতে চান  নাই।  তাই তারা ফের সোমালিয়ায় ফিরে গিয়েছেন। চাচ্ছেন আরেকটি সন্তানও।

আমার প্রশ্ন ছিল সোমালিয়াতে নিরাপত্তার অভাব হতে পারে, যেটা উনারা কানাডাতে পেতেন। এটা শুনেই ভদ্রলোক বললেন না ডাক্তার, আমি ভীষণ চিন্তিত
থাকতাম ওখানে সবর্ক্ষণ। কারণ ওরা অনেক  কিছু করতে পারে, যা সেখানে সামাজিকভাবে, স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয়। তাতে কোন অন্যায় নেই সেইটাই ভাবে। আর ছেলেমেয়েরা তাতে নিজে থেকেই অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু সেটা  আমাদের মেনে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু এরকম কিছু সোমালিয়াতে করা যায় না। আর সাধারণভাবে তারা নিজে থেকেও করবে না, কারণ সংস্কৃতিতে বাধা আছে।

তাদের আহাজারি শুনে ভাবছিলাম আমরা অনুন্নত দেশের মানুষ  ছুটে চলেছি। পাড়ি জমাচ্ছি উন্নত দেশে। কখনো পড়াশোনার জন্য, কখনও জীবিকার জন্য। মোদ্দাকথা একটু ভাল থাকার আশায়। কিন্তু তাতে কি হারিয়ে ফেলছি বা ফেলব তা বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়।  আর একটি কারণ খুবই স্পষ্ট ছিল। তাদের মতে প্রথম জেনারেশন যাদের সত্যিই কষ্ট ছিল, টাকার দরকার ছিল। তারা না গেলে পরিবারের উন্নতি হবেনা, তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে বা অনেক কিছুই গোপন করে গেছে (বিদেশে আছি এই শান বোঝাবার জন্য)। সেই  একই জীবনের পুনারাবৃত্তি তাদের মত দ্বিতীয় বা তৃতীয় জেনারেশন হয়তো আর চায়না।

এরই নাম জীবন; জীবন নামের সংসার।
দেশকণ্ঠ/আসো


 

  মন্তব্য করুন
AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।