• সোমবার, ০২ অগাস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮  নিউইয়র্ক সময়: ২১:৪৩    ঢাকা সময়: ০৭:৪৩

বর্ষায় গাছের পরিচর্যা

কনক বড়ুয়া
গাছ হলো মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম। গাছ যে অক্সিজেন দেয় তা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে গাছ । গাছের উপকারের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তাই এই গাছকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের নিতে হবে বিশেষ যত্ন। শখ করে কিংবা প্রয়োজনে একটা চারা এনে লাগালেন। দেখলেন,  দু’রাতের অঝোরধারায় সে গাছের গোড়ায় পানি জমে শিকড় পঁচে গাছ ঢলে পড়েছে । ওদিকে বৃষ্টির দাপটে বাগানের অনেক গাছই বেঁকে গিয়েছে । বর্ষার পানি গাছের বন্ধু বটে, কিন্তু তার দাপটের সাথে রয়েছে বৈরীতা। তাই এমনভাবে বাগান সাজাতে হবে, যাতে শুধু বৃষ্টির পানিটুকুই গাছ পায়। কিন্তু তার দাপট ও ক্ষয়ক্ষতি যেন গাছকে স্পর্শ করতে না পারে।
 
বৃষ্টির পানি গাছের জন্য অনেক উপকারী। বৃষ্টির পানি অন্যান্য পানি থেকে অনেক পুষ্টিসমৃদ্ধ। কারণ এতে রয়েছে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড,  নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফেট ও নাইট্রেট আয়ন। এ কারণে বর্ষাকালে গাছের পাতাগুলো বেশ সজীব হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানির অতিরিক্ত অক্সিজেন গাছকে সতেজ ও সজিব করে, নাইট্রেট আয়ন গাছের প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন মোটামুটি  সুনিশ্চিত করে। খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, এক পশলা বৃষ্টির পর ছাদ বা বারান্দার বা আশেপাশের গাছগুলি কেমন সতেজ হয়ে ওঠে। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টি গাছের জন্য  ক্ষতিকর। অনেক গাছ মারাও যেতে পারে। বর্ষাকালে গাছের এই ক্ষতিকর দিক, কিভাবে সমাধান করা যায় ও গাছের ফলন বাড়ানোর উপায়- জেনে নিতে পারেন এই আলোচনা হতে।
 
প্রথমেই চারা গাছের কথায় আসি। বর্ষাকালে চারাগুলোকে কোনও শেডের তলায় নিয়ে রাখতে হবে। অথবা ছাদের একটা পাশে নিয়ে গিয়ে তার উপরে টিন বা অ্যাসবেসটস দিয়েও ঢেকে দিতে পারেন। শেডের সুবিধে না থাকলে চারাগুলিকে বারান্দার কোণে বা চিলেকোঠার ঘরের জানালার কাছেও রাখতে পারেন। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি কিছু গাছ যেমন ক্যাকটাস বা সাকুলেন্ট জাতীয় গাছের জন্য ক্ষতি বয়ে আনে। তাই এদের খোলা আকাশের নিচে না রাখাই ভালো। এই জাতীয় গাছগুলোকে ছাউনির মধ্যে বা ঘরের মধ্যে রাখা উচিত।
 
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গাছে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যে কোন গাছ বাগানের হোক কিংবা ভিটেবাড়ির গাছের গোড়ায় যাতে পানি জমে না থাকে তার জন্য পানি সরে যাওয়ার পথ করে দিতে হবে। আবার পানির সাথে সাথে গাছের গোড়া হতে প্রচুর মাটি সরে গিয়ে গাছের ক্ষতি হয় ব্যাপক। বর্ষার পানিতে ধুয়ে যাওয়া মাটির উপরের স্তরের সঙ্গে মাটির সার, উর্বর অংশটুকুও ধুয়ে যায়। ফলে গাছ পানি পেলেও পুষ্টি পায় না। তাই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে পানির স্রোত যেন গাছের গোড়া দিয়ে না যায়। তবুও কিছু বৃষ্টির পানি পড়ে গাছের গোড়ার মাটি সরে যায়। তাই গাছের চারপাশে আট বেঁধে দিয়ে এই মাটি সরে যাওয়া রোধ করতে পারেন। সরে যাওয়া মাটি পুণরায় বাইরে থেকে এনে গাছের গোড়া আবার ভরাট করে দিতে হবে। মাটির ক্ষয় রোধে গাছের কাণ্ড থেকে প্লাস্টিক বেঁধে মাটি ঢেকে রাখতে পারেন। তবে অস্বচ্ছ আবরণের পরিবর্তে পারফোরেটেড শিট দিয়ে  উপরটা ঢেকে দিতে পারেন। এতে বৃষ্টির পানি চুঁয়ে চুঁয়ে মাটিকে পুষ্ট করবে। এঁটেল মাটি বেশি ব্যবহার করতে পারেন। এই মাটি খুব তাড়াতাড়ি জল টেনে নেয়।
 
যে কোন ঘরোয়া গাছের জন্য এমন টব বা পাত্র বাছাই করা দরকার যাতে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজন মত ছিদ্র থাকে। আর ইদানীং বড় বড় ড্রাম ব্যবহার করা হয়। তাই এই ড্রামগুলোতে যেন নির্দিষ্ট পরিমাণ ছিদ্র থাকে তা খেয়াল রাখা জরুরি। গাছের গোড়ায় যাতে পানি জমতে না পারে তার জন্য টবের নীচে অন্তত দুটো গর্ত করে রাখবেন। মাটিতে একটা গর্তের মুখ বন্ধ হয়ে গেলেও অন্য গর্তটি পানি বের করতে সাহায্য করবে। দু’তিন দিন পর পর দেখে নিতে হবে গর্তের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিনা। বাগানের জমিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা কেটে বাগানের মধ্যে একটা জায়গায় গর্ত করে বড় টব বসিয়ে রাখতে পারেন। সারা বাগানের পানি নালা দিয়ে সেই পাত্র ভরে থাকবে। পরে অন্য কাজে বা বাগান পরিচর্যায় ব্যবহার করেতে পারেন সেই পানি। যদি বৃষ্টির পরে টবে পানি জমে তাহলে টব একদিকে কাত করে পানি ফেলে দিতে হবে। আর মাটি না শুকালে একটু খুচিয়ে দিতে হবে যাতে সম্পূর্ণ মাটি শুকিয়ে যায়। আর যদি গাছের মাটি শুকানোর ব্যবস্থা না থাকে তাহলে টব ঝড় বৃষ্টির সময় ঘরে এনে রাখাই উত্তম। এখন বর্ষাকালে যে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ দেখা দেয় তার অন্যতম একটি কারণ টবে জমা পানি। তাই গাছের টবে কোনভাবেই পানি জমতে দেয়া যাবেনা।
 
বর্ষা মৌসুমেও গাছে কি পানি দেয়া উচিত? এর উত্তর হলো, না। গাছে আপাতত পানি দেয়া বন্ধ থাকবে। অতি বৃষ্টির ফলে গাছে পানির ঘাটতি পূরণ হয়। তাই গাছের মাটি না শুকানো পর্যন্ত পানি দেয়া উচিত নয়। তবে ঘরের অর্থাৎ একেবারে ইনডোর ডেকোরেশনে রাখা গাছে পানি দিতে হবে প্রয়োজন মত। একটা কথা মাথায় রাখা উচিত পানির অভাবে গাছ মরে না। কিন্তু পানির পরিমাণ বেশি হলে গাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গরমের সময় যেমন টবের মাটি কয়েক ইঞ্চি নীচ পর্যন্ত ভরাট করতে হয়। তেমনই বর্ষাকালে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য টবে মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া উচিত। যাতে পানি তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। অতিবৃষ্টির সময় অবশ্যই এমন ধরণের মাটি নির্বাচন করতে হবে; যাতে মাটি খুব দ্রুত পানি শুষে নিতে পারে। আর তাই এর জন্য এঁটেল মাটি ব্যবহার করা উপযোগী। মাটি তৈরির ক্ষেত্রে মাটির সাথে সার মেশানোর সাথে সাথে বালু ও নুড়িপাথর বেশি পরিমাণে মিশিয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোকোডাস্ট বা পার্লাইট মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নেয়া যায়।
 
বর্ষাকালে সার প্রয়োগ না করাই ভাল। কেননা বৃষ্টির পানিতে যে পরিমাণে নাইট্রোজেন বা অন্যান্য উপাদান থাকে তা গাছের খাদ্য হিসেবে কাজ করে। যদি সার দেয়া দরকার মনে হয় তাহলে জৈব সার দিতে হবে। তবে প্রয়োজনে সীমিত পরিমানে রাসায়নিক সারও ব্যবহার করা যেতে পারে।  এমনও জায়গা আছে যেখানে বর্ষার পানিতে উপরের স্তরের মাটি অনেকটাই ধুয়ে যায়। তার সঙ্গে খানিক পুষ্টিও চলে যায়। সে সব জায়গার গাছে সার দিতে হবে নিয়মিত। যাতে গাছের পুষ্টির জোগানে ঘাটতি না হয়। তবে এ সময়ে গলা-পঁচা সারের তুলনায় শুকনো সারের উপরে ভরসা রাখাই ভালো। চায়ের পাতা রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে, হাড়ের গুঁড়ো, ডিমের খোসা শুকিয়ে গুঁড়ো করে দিতে পারেন।
 
সারের মতোই বর্ষাকালে কীটনাশক ব্যবহারেও হতে হবে সাবধান। বর্ষার আর্দ্র পরিবেশে পোকামাকড়ের দৌরাত্ম্য বাড়ে। এরা নতুন পাতার রস খেতে গাছে জড়ো হয়। ছোট পিঁপড়ে থেকে শুরু করে এক ধরনের সাদা পোকাও লেগে যেতে পারে গাছে। পোকামাকড় নিধনে জৈব কীটনাশক প্রয়োগ করাই শ্রেয়। তাই বর্ষায় প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে নিম অয়েল, গোলমরিচ গুঁড়ো, শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো দিতে পারেন গাছের গোড়ায় বা পোকা লাগা অংশে। ৫ মিলি লিটার নিমের তেল, ১০ ফোঁটা সাবান পানি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতায় স্প্রে করে দিতে পারেন। এতে কাজ না হলে রাসায়নিক কীটনাশকের শরণাপন্ন হতে পারেন। এই বর্ষায় বৃষ্টির পানি জমে থাকার ফলে গাছে ছত্রাকের আক্রমন ও হতে পারে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হাতের কাছের যে কোন ফানজিসাইড স্প্রে করতে পারেন।
 
ঝড় বৃষ্টিতে অনেক সময় গাছ, বিশেষ করে চারা গাছ একদিকে হেলে যায়, ভেঙেও যেতে পারে। তাই গাছের অবস্থান ঠিক রাখার জন্যে গাছের সঙ্গে খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। লতানে গাছ মাচায় তুলে দিন। অনেক সময়েই দেখা যায়, বর্ষাকালে স্যাঁতসেঁতে, ভেজা আবহাওয়ায় বাগান, ছাদ  বা টবের গাছের গোড়ায় উপরের স্তর পুরো সবুজ শ্যাওলা ও পরজীবীতে ঢেকে যায়। এই শ্যাওলা কিন্তু অক্সিজেন গাছের গোড়ায় পৌঁছতে দেয় না। পরজীবী উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদান শুষে নেয়। এভাবে এরা গাছের বৃদ্ধি রোধ করে। তাই পরজীবী ও শ্যাওলার অংশটুকু খুরপি দিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলে দিতে হবে।
 
মাঝে মাঝে দেখা যায় গাছের মাটিতে অনেক কেঁচো। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কারণ কেঁচোকে প্রকৃতির লাঙল বলা হয়। এই কেঁচো মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এরা বন্ধু কীট। মাটি খুঁড়ে যেমন মাটি উর্বর করে তেমনই নাইট্রোজেনের জোগান দিয়েও গাছকে পুষ্টি দেয়। তাই কোনও গাছের গোড়ায় যদি দেখেন, একাধিক কেঁচো জমা হয়েছে, তাদের তুলে অন্যান্য গাছের টবে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে পারেন। এতে সব গাছেরই উপকার হবে। অনেক সময় পিঁপড়া বা অন্যান্য ছোট ছোট পোকামাকড়  টবের নিচে বাসা তৈরি করে। এ সব পোকামাকড় গাছের অনেক ক্ষতি করে। তাই গাছের টব সরিয়ে নিয়ে পোকামাকড় ধ্বংস করতে হবে।
 
বর্ষাকালে গাছের প্রুনিং করা বেশ জরুরী। অনেক গাছই এসময় খুব ঝাঁকড়া হয়ে যায়। ফলে একনাগাড়ে অনেক দিন বৃষ্টির পরে মাঝেমাঝে রোদ উঠলেও গাছের সব জায়গায় সেই রোদ পৌঁছায় না। বিশেষ করে শিকড়ে রোদ ও অক্সিজেন না পৌঁছালে গাছের গোড়া পঁচে যেতে পারে। তাই গাছের ডাল ছেঁটে দিতে হবে। ফুলের গাছে যে ডালে ফুল শুকিয়ে যাবে, তা কেটে দিতে পারেন। তা হলে সেখান থেকে আবার নতুন কুঁড়ি জন্মাবে। গাছ কাটার সময়ে ডিম্বাকার, গোল বা চৌকো ধরনের কোনও আকার দিতে পারেন ভালো লাগবে। অবাঞ্চিত কান্ড বা পাতা থাকলে গাছকে যেমন অসুন্দর লাগে তেমনি গাছে খাদ্য বা পানি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
 
বর্ষায় গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়। গাছ লাগান। গাছের যত্ন নিন। আপনি সুরক্ষিত থাকুন। দেশকে সুরক্ষিত রাখুন। আগামী দিনের জন্য একটি সুস্থ ও সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলুন।
কনক বড়ুয়া, কৃষিবিদ,  প্রকল্প কর্মকর্তা (পজীপ, বিআরডিবি) kanakctgdhcx@yahoo.com
দেশকণ্ঠ/অআ
 

  মন্তব্য করুন
AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।