• শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮  নিউইয়র্ক সময়: ১০:০৪    ঢাকা সময়: ২০:০৪

প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগ : মগজ ও হৃদয়

  • মতামত       
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১       
  • ১৬৮

অনিরুদ্ধ ব্রতচারী : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের নবম বিভাগে উল্লেখিত প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগ কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব মন্ত্রীপরিষদ তথা সরকারের। মন্ত্রীপরিষদ সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন বা জরুরী বিবেচনায় অধ্যাদেশ জারি করে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগ পরিচালন অর্থাৎ গঠন, পুনর্গঠন, নিয়োগ, পদোন্নতি, অবসর, পদায়ন, প্রশিক্ষণ, ছুটি, বেতন, ভাতা, সুবিধা, শাস্তি ইত্যাদি  নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিব নগর সরকার) গঠন করে প্রজাতন্ত্রের কর্ম বিভাগ চালু করে যুদ্ধ পরিচালনাসহ অন্যান্য কার্যাদি নির্বাহ করেছিল; সরকারের কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর সংস্থা ছিল। সমগ্র বাংলাদেশকে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে আঞ্চলিক প্রধান করে তার অধীনে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা করে তৎকালীন আওয়ামী লিগ সরকার। যুদ্ধকালেও জনগণের শাসন নিশ্চিত করেছিল আওয়ামী লিগ যা পরবর্তীতে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে লেখা রয়েছে এবং এর আলোকে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ এটাই ছিল বাংলাদেশ জন্মকালীন প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের জন্ম লগ্নে যে প্রশাসন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অধীনে এবং সাথে কাজ করেছে পরবর্তীতে সরকারের নেতৃত্ব গুণেই সেই প্রশাসন জনপ্রতিনিধিদের প্রতিযোগী করা হয়েছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে উঠে এসেছে কার ক্ষমতা বেশি! নেতার চেয়ে কর্মীর ক্ষমতা কি বেশি হয়? আগের বিশৃংখলার ইতিহাস অনুযায়ী রাজনীতিক নেতৃত্বের অধীন আমলাকে বিদ্রোহী করে তোলার বা নেতাকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে নিজ কর্মীর ক্ষতি করার চক্রান্ত ধরে নেওয়া যায়। এসব চক্রান্তে জনগণেরই কপাল পুড়েছে। 
 
এই ভুখন্ডে বাংলাদেশ মোঘল, ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে। এই শাসনের হাতিয়ার ছিল এলিট শ্রেণী এবং প্রশাসন। প্রাশন সবসময় ছিল, আছে এবং থাকবে সে হিসাবে জনপ্রত্যাশা বেশি, প্রশাসনের কাছে জনগণের দাবী হল, রাজনীতি বা অন্যভাবে আশা নির্বাহী নেতারা বেঈমানি ইত্যাদি করতে পারে কিন্তু স্থায়ী কর্তা আমলা কেন করবে, সে তো নিরপেক্ষতা রক্ষা করবে ইত্যাদি। রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক যে সরকারই হোক উদ্দেশ্য থাকে জনগণের কল্যাণ সাধন করে সন্তুষ্টি আদায় করা। এখানেই নেতৃত্ব ধরন বা গুণ নির্ভর করছে। এই নেতৃত্ব দিয়েই প্রসাশনকে পরিচালিত করে জনগণের সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়। এর শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিচালিত প্রশাসন। এমন কি স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার পাকিস্তানের রেখে যাওয়া প্রশাসনকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বিনির্মান, উন্নয়ন, মানবিকতার প্রতিষ্ঠা এবং বৈদেশিক সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কোন দেশে গেলে সে দেশের নেতাদের নামই সামনে আসে সর্বাগ্রে- বলা হয় তোমার প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী খুব ভালো করছেন বা খারাপ করছেন ইত্যাদি। সেখানে কখনই আমলার নাম উচ্চারিত হয় না। বড় জোর বলা হয়ে থাকে তোমার অমুক অফিসারকে আমি চিনি বা তুমি খুব ভালো প্রশাসন চালাচ্ছ। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে নেতাই সামনে আসেন। 
 
জনগণের নিকট কমিটমেন্ট কিন্তু নেতারাই করে আমলা নয়, সংসদে আইন পাশ বা কোন সমালোচনা নেতাই করেন, সংসদীয় কমিটি জবাবদিহি করেন তারাও নেতা, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক আমলাদের আয়-ব্যয়ের যে হিসাব দাখিল করেন, সেটা সংসদেই নেতারাই আলোচনা করে থাকেন এমন কি নেতাদের নিয়ে গঠিত সংসদের পাবলিক একাউন্টস কমিটি আমলার দায়মুক্তি দিয়ে থাকে। কোন আইডিয়া বা প্রস্তাব নেতা বা মন্ত্রী বলে থাকেন যার আলোকে টেকনিক্যাল বিষয়াদি কর্মবিভাগ বা আমলারা দেখেন, জনমত সংগ্রহ করেন, বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়া, দেশ বিদেশের দৃষ্টান্ত নেয়া, আইনি ও পরিবেশগত বিষয়াদি মতামত নেওয়া, বিভিন্ন ধরনের বিষয়ভিত্তিক টেকনিক্যাল কমিটির মতামত ইত্যাদি সংগ্রহ করে একাধিক আন্তমন্ত্রণালয় সভা, সচিব কমিটির সভা, মন্ত্রীসভা ইত্যাদি নিয়ম কানুন মেনে প্রস্তাব চলে যায় সংসদে ৩৫০ জন রাজনৈতিক নেতাদের নিকট। সাংসদ প্রস্তাবিত আইন বিধি ভালোভাবে পড়েন যৌক্তিক বক্তব্য বা সংশোধনি পরামর্শ দিয়ে থাকেন, সেগুলো সংসদ ভোটে দেয়, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি অধিকতর যাচাই বাছাই করে (এ পর্যায়ে যেকোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতামত নিতে পারে), সর্বশেষ সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য প্রেরণ করে। এই পর্যায়েও মহামান্য রাষ্ট্রপতি কোন মতামত দিয়ে সংসদে ফেরত দিতে পারেন বা স্বাক্ষর দিয়ে প্রেরণ করতে পারেন। পরবর্তীতে গেজেট হয়ে বাস্তবায়নে চলে যায়। অর্থাৎ আইন কানুন প্রণয়নে এবং বাস্তবায়নে জনগণের অভিপ্রায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বে, পরামর্শে, বিচার বিশ্লেষণে প্রশাসনের মাধ্যম কাজ করছে। এই তৈরি করা আইন নিয়ে আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন হলে মন্ত্রির সম্মতিতে  জবাব আমলাদেরকেই দিতে হয়, হাজিরা দিতে হয় এমন কি আদালত অবমাননাও মোকাবেলা করতে হয়। আদালতের কোন নির্দেশনা বা সাজেশন আমলার নিকটই আসে যা পরবর্তীতে মন্ত্রির নিকট উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রশাসনের সাথে যে কোয়ালিশন আছে সেটা অনস্বীকার্য। এজন্য সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, ‘একশটা দল মিলে সরকার হতে পারে কিন্তু আমলাদের সাথে মিলে যে সরকার চলে সেটাই হল রাইট কোয়ালিশন সরকার।‘ তাই এ ক্ষেত্রে নেতার আসনে যিনি আছেন তার যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে নীরিখে বর্তমানে বাংলাদেশের নেতারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক অনেক ভালো করছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যা যা চেয়েছে জনস্বার্থে যেমন, জনগণের অংশগ্রহণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আদালতে আইনের আশ্রয় লাভ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মান, ইকনমিক এক্টিভিটিজ বৃদ্ধি, বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নতকরণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন, সংবিধানের সংশোধন, মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ, বাজেটের আকার বৃদ্ধি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, দূর্ণিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সামরিক শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি আমলারাই করে যাচ্ছে, বাইরের কেউ এসে করে দিচ্ছে না! এটাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের  সফলতা। প্রজাতন্ত্রের সরকার হলো ব্রেইন আর কর্মবিভাগ হলো হৃদপিণ্ড বা হার্ট এ দুটি একসঙ্গে কাজ না করলে বা যে কোন একটা বিগড়ে গেলে বিপত্তি নেমে আসে। এসব নষ্ট করবার প্রয়াসে জোর করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে প্রজাতন্ত্রের কর্মীবাহিনীর (আমলাদের) এবং কর্মীবাহিনীর নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ তৈরির গভীর প্রচেষ্টা দেখা যায়। 
 
যেভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে সে অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগের দীর্ঘদিনের কিছু অচলায়তনকে পাল্টে দেবার প্রয়োজন আছে। সরকার যে আংগিকে বিভিন্ন সুদুরপ্রসারী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে কর্মবিভাগের উপর নির্ভর করে সে লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনিক সংস্কার করা অতিআবশ্যক হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রথম এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস রিওরগানাইজিং কমিটি করে বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কার শুরু হয়। পে এন্ড সার্ভিস কমিশন, ১৯৭৬/৭৭, মার্শাল ল কমিটি ফর এক্সামিনিং অর্গানাইজেশনাল সেট-আপ অব মিনিস্ট্রি/ডিভিশন/ডিরেক্টরেট এন্ড আদার অর্গানাইজেশন, ১৯৮২, দি কমিটি অব এডমিনিস্ট্রেটিভ রিওরগানাইজেশন/রিফর্ম, ১৯৮৩, কেবিনেট কমিটি অব এডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্ম- ১৯৯৩, এডমিনিস্ট্রেটিভ রিওরগানাইজেশন কমিটি ১৯৯৩ (১৯৯৬) এবং  পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন রিফর্ম কমিটি ১৯৯৭  করা হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন ও দাতা সংস্থার পরামর্শগুলকে যাচাই বাছাই করে গ্রহণ করার যৌক্তিকতা নির্নয় ছিল এসব কমিটির উদ্দেশ্য। মোটা দাগে যা হয়েছে তা অতীত; বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগ তথা প্রশাসনিক সংস্কার খুব প্রয়োজন, না হলে ব্রেইন আর হৃদপিণ্ডের কার্যকর কোয়ালিশন হবে না! মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের সাথে সরকার পরিচালনায়ও উত্তরণ প্রয়োজন।
দেশকণ্ঠ/আসো

  মন্তব্য করুন
AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।