• শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮  নিউইয়র্ক সময়: ০৯:৪৫    ঢাকা সময়: ১৯:৪৫

গ্রামীণ কৃষি বাস্তবতা ও সমন্বিত উন্নয়ন

  • মতামত       
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১       
  • ৭১

তানভীর শাতিল  
সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে গ্রামীণ জীবনধারায় উন্নয়নের যে ছোঁয়া লেগেছে, তার আলোচনা বিস্তৃত আছে। এ আলোচনাগুলোর মাঝে আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বরটাই প্রকট। আর এই গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় গ্রাম ‘অপরিকল্পিতভাবে’ শহরের আবহে পরিবর্তিত হতে থাকার দৃশ্য। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে গঞ্জ, উপশহর, শহর, মহানগর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যোগাযোগ প্রেক্ষিত গত দশকজুড়ে দ্রুত পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে, বিশেষ করে অবকাঠামোগতভাবে অনেক দূরেই হেঁটে এসেছে আজকের ’ডিজিটাল বাংলাদেশ’। পরিবহন, যোগাযোগ আর ডিজিটাল (ভার্চুয়াল) সব ক্ষেত্রেই যতটুকু উন্নতি সাধন হয়েছে, তার যথায়থ সৃজনশীল ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে নজর দেয়ার সময় এসেছে বলে অনুধাবিত হয়। যথাযথ ব্যবহূত হচ্ছে কিনা বলতে, গ্রামীণ সমাজের প্রান্তিক চাষীদের জীবনমান উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে? আর এ জীবনমান উন্নয়ন কি কেবলই আর্থসামাজিক? সংস্কৃতি, রাজনীতি, রাজনৈতিক-অর্থনীতিসহ নানা দিক বিবেচনা করে সবকিছু মিলিয়ে দেখলে অনেক বিষয়ই সামনে চলে আসে। সেসব ্আলোচনা এ পরিসরে পেড়ে কুলিয়ে ওঠা যাবে না। তবে পেশাগত কাজের সুবাদে গ্রামীণ কৃষকসমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বিষয় সামনে নিয়ে আলোচনা এগোতে চাই।
 
 
পরিবহন ও রাস্তাঘাটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান একটা বিষয়, গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নগরমুখিতার চিত্রও দৃশ্যমান। গ্রামীণ কৃষি শ্রমিকের রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে অভিবাসন, নগরে জনসংখ্যার চাপ সবই সবার জানা। বাংলাদেশে বস্ত্র শিল্পের বিকাশেও গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক নারী শ্রমিকরা নগরের কারখানার চাকা সচল রেখেছেন। আপাতদৃষ্টিতে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে বটে, কিন্তু এই গ্রামের শিকড় থেকে উঠে আসা মানুষগুলো কি নগরে শিকড় খুঁজে পায়? তা যে তারা পায় না, তার প্রমাণ এই করোনা মহামারী আমাদের দেখিয়ে গেছে। কত মানুষ নগরে তাদের কর্ম হারিয়ে গ্রামে ফিরে গেছে তার সঠিক হিসাব নেই। এখন প্রশ্ন হলো, যে মানুষগুলো গ্রামে ফিরে গেল, তারা কি ভরসায় গ্রামে গেল? গ্রামে কি তাদের এমন কোনো উপায় আছে যে তারা অন্তত এই মহামারীকালে কোনো রকমে টিকে থাকতে পারে। আর এ জায়গাতেই গ্রামীণ কৃষির শক্ত ভিত্তিটা প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে সাম্প্রতিক সময়ে শহুরে হাওয়া প্রবাহিত হলেও কৃষকের কৃষির প্রতি ভালোবাসায় এখনো প্রকট প্রভাব ফেলতে পারেনি। এখনো গ্রামে নিজের এক ফালি জমি চাষাবাদ করে চলতে পারা, নিজেকে কৃষক হিসেবে পরিচয় দেয়া ক্যাজুয়াল লেবার কিংবা ঢাকায় গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করার চেয়ে সম্মানের সঙ্গে দেখা হয়। যদিও গ্রামীণ কৃষিসমাজের সনাতনী রূপ পরিবর্তন হয়েছে ধাপে ধাপে। ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন থেকে শুরু করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক (ক্ষুদ্রঋণ) প্রাপ্যতা অনেক বিষয়ই কাজ করেছে এ পরিবর্তনের পেছনে। ২০১৪-১৫ সালের দিকে ব্র্যাক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে হাতে নেয়া বর্গাচাষী উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ থেকে পরিচালিত একটা গবেষণায় কাজ করার সময় মাঠ পর্যায়ে একটা বিষয় চোখে পড়ে, গ্রামীণ স্মল হোল্ডার বা ক্ষুদ্র কৃষক খানাগুলো জীবিকার বহুমাত্রিকতার দিকে ঝুঁকছে। অনেকে কৃষি টেকনোলজিকে কেন্দ্র করে এক ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ দাঁড় করিয়েছেন নিজের কৃষিকাজের পাশাপাশি। আবার হয়তো এমনও দেখা গেছে নিজের কৃষিজমিতে কাজ করার পাশাপাশি অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে কিংবা ঋণ করে একটা রিকশা-ভ্যান কিনে চালাচ্ছেন সংসারের আয় বাড়ানোর জন্য। নারীরা গবাদি পশু-পাখি পালন, সেলাইয়ের কাজ করছেন কিংবা অনেক পুরুষ সদস্য গ্রামে কৃষিকাজ কমে এলে নগরে সিজনাল মাইগ্রেশন করছেন। এমন একটা ঘটনা এখানে উদাহরণ হিসেবে প্রাসঙ্গিকতা পায়, একজন ক্ষুদ্র কৃষককে দেখেছিলাম বোরো মৌসুমে আবাদের খরচ জোগানোর জন্য ঢাকায় রিকশা চালাতে গিয়েছিলেন দু-তিন মাসের জন্য, আর এই দু-তিন মাস ঢাকায় রিকশা চালিয়ে যে টাকা সঞ্চয় করেন, তা গ্রামে কৃষিজমিতে আবাদের পেছনে খরচ করেন। এ আবাদ থেকে তার কী পরিমাণ লাভ হয় সে আলাপে যতদূর মনে মনে পড়ে ওই ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘কৃষিতে তেমন লাভ নাই, নিজের জমির বাত খাই সেটাই শান্তি। বাজার থেকে চাউল কিনে খাইলে কৃষক হিসাবে মান থাকে না।’
 
আবার এমন কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যারা একসময়ে ঢাকায় থাকতেন, রিকশা চালানো, গার্মেন্টে কাজ করা কিংবা বাসাবাড়িতে ঝিয়ের করাসহ নানা ধরনের কাজ করতেন। বেশ দীর্ঘ একটা সময় শহরে থেকে কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছেন, গ্রামে এসে কিছু জমি বন্ধক নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানতে পেরেছিলাম যে তারা দীর্ঘ সময় শহরে থাকলেও শহরে জায়গা করে নিতে পারেননি কিংবা শহরে জায়গা করে নেয়ার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশও দেখতে পাওয়া যায়নি। তারা মনে করেন, শহর সারা জীবন থাকার জন্য জায়গা নয়, শহর তাদের না, বরং গ্রামই তাদের আপন। গ্রামে এক চিলতে ভিটেবাড়ি, অল্প কিছু আবাদি জমি শহরের শিকড়হীন জীবনের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চয়তা দেয়। এখনো যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে এমন নয়, গ্রাম থেকে উঠে আসা শ্রমিকশ্রেণীর মানুষ গ্রামেই নিজের ঠিকানা খুঁজে ফেরেন। গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে সম্প্রতি গ্রামে গিয়ে একটা বিষয় যেন হঠাৎই প্রকটভাবে চোখে পড়ল, অনেক কৃষিজমির ওপর ছোট ছোট বসতভিটা গড়ে উঠছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে এই ছোট ছোট ভিটা যারা তৈরি করছেন, তাদের বড় একটা অংশ একসময় ঢাকায় বা অন্য কোনো শহরে কিংবা বিদেশে কাজ করত। বেশ কয়েক বছর কাজ করে কিছু সঞ্চয় নিয়ে গ্রামে ফিরেছেন, অনেকেরই হয়তো নিজের কোনো জমি ছিল না, তারা একচিলতে জমি কিনে নিজেদের ঠিকানা বানাচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমার পর্যবেক্ষণ, অধিকাংশ পোশাক শ্রমিক জীবনের শেষ ভাগটায় গ্রামে থিতু হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই শহরে কাজ করছেন।
 
 
এ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে কৃষক সমাজে প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলো সনাতনী বর্গা চাষ ব্যবস্থা থেকে সরে এসে জমি বন্ধক বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে জীবিকার বহুমাত্রিকতার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় খানার পুরুষ সদস্যরা কৃষির পাশাপাশি অন্যান্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে নারীরা কৃষির অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশে, বিশেষত কৃষি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। পুরুষ খানা প্রধানের অনুপস্থিতিতে নারীরাও কৃষিকাজের সামগ্রিক দেখভাল করছেন। কৃষিতে নারীর অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিতে গ্রামীণ কৃষক সমাজে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, যা নতুন এক আশা জাগায়, যদিও কৃষিতে নারীর অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিতে এখনো অনেক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা বিরাজমান। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের কথাও বলা যায়।
 
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই গ্রামীণ কৃষিসমাজকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলো এ ডিজিটাল সময়ে যতটা জোরদার হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা আশানুরূপ হয়নি। সরকারি-বেসরকারি গ্রামীণ উন্নয়ন উদ্যোগগুলোয় প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে আগ্রহের জায়গাটা অনেকটাই অনুপস্থিত। বিশেষত এই গ্রামীণ প্রান্তিক চাষীদের জীবন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে চিন্তা করে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের সংখ্যা খুবই কম। এর মধ্যে সম্প্রতি সময়ের প্রধানমন্ত্রীর অনুরাগভাজন একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি গ্রামীণ কৃষক সমাজকে লক্ষ্য করে এগোলেও খুব বেশি সফলতা পেয়েছে এমন খবর পাওয়া যায় না কিংবা কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব চালুর পর এ ব্যাংক হিসাব বা প্রান্তিক কৃষকদের মূলধারার ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংযুক্তকরণ উদ্যোগ, তারও যথাযথ ব্যবহার গ্রামীণ সমাজে চোখে পড়ে না। এ উদ্যোগগুলো সামগ্রিকভাবে সফলতার গল্প না বলতে পারলেও অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়নের ছাপ রেখে যায়, যেমন কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো প্রান্তিক কৃষকদের ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
 
১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো কতটা বহুমাত্রিকতার সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবলে অনেক বিষয়ই সামনে আসতে পারে। যেমন একবার আমার গ্রামের এক কৃষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বোরো মৌসুমে সেচ খরচ নিয়ে। তার বলা কথা থেকে জানতে পারি, কৃষকের সেচে সরকার যে ভর্তুকি দেয়, বিশেষ করে বিদ্যুতে, তাতে মূলত প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হতে পারেন না। এ ভর্তুকির টাকা প্রান্তিক কৃষক অবধি পৌঁছে না। কেননা গ্রামে যারা সেচ পাম্পের মালিক, তারা সাধারণত ধনী ব্যক্তিই হয়, তাদের উপরের লেবেলে যোগাযোগ ভালো। বিদ্যুতের লাইন আনা থেকে শুরু করে সেচ পাম্প স্থাপন করাসহ সব মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকার প্রয়োজন, যা একজন প্রান্তিক কৃষকের কাছে থাকে না। তাছাড়া আবাদি জমির মালিক না হয়ে সেচ ব্যবসা করা মুশকিল। ফলে প্রান্তিক কৃষকরা সেচ মালিকদের হাতে আটকা। মৌসুমের শুরুতে সেচ মালিকরা নিজেদের ইচ্ছামতো সিকিউরিটি মানি বা জামানত নির্ধারণ করেন। এই সেচ মালিকদের মাঝেও একটা সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা নিজেদের সুবিধামতো সেচ খরচ ও জামানত নির্ধারণ করেন। যদিও তারা সেচের জন্য সরকারি প্রণোদনা পাণ, তবুও বার্ষিক বা মৌসুমি সেচ খরচ নির্ধারণে তারা তা তোয়াক্কা করেন না। তার মতে, কৃষকের আবাদ অনুযায়ী সরকারি একটা তালিকা থাকা দরকার। আর এ তালিকাভুক্ত কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে তার প্রাপ্য প্রণোদনা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। তার মতে, মোবাইল ব্যাংকিং হলে কৃষকের জন্য আরো সুবিধা হয়।
 
এ সেচ নিয়ে আরো কিছু প্রেক্ষিত জানতে পেরেছিলাম ব্র্যাক গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ ও মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন কর্তৃক পরিচালিত সিস্টেম অব রাইস ইন্টেনসিফিকেশন (এসআরআই) বা নিবিড় পদ্ধতিতে ধান চাষবিষয়ক ভিন্ন আরেকটি পরীক্ষামূলক (এক্সপেরিমেন্টাল রিসার্চ বা আরসিটি) গবেষণায় কাজ করার সময়ে। এ গবেষণার অংশ হিসেবে প্রান্তিক কৃষকদের নিবিড় পদ্ধতিতে ধান চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এসব প্রশিক্ষণ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাঠকর্ম করার সময় একজন নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে জানতে পারি, তাদের কেউ যদি নিজের ইচ্ছামতো বা সুবিধার জন্য একটু আগেভাগে অল্প বয়সী ধানের চারা রোপণ করতে চান, তা সম্ভব হয়ে ওঠে না কেবল সেচ ব্যবস্থায় তার কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে। অন্যান্য কৃষক জমিতে কাজ শুরু না করলে সেচ মালিকরা সেচ দিয়ে পুষিয়ে উঠতে পারেন না। অন্যদিকে জমিতে পানি যাওয়ার নালা প্রস্তুতকরণ ও পানির অপচয়সহ অনেক যুক্তি সেচ মালিকদের কাছেও আছে। আর এমন পরিপ্রেক্ষিতে নিবিড় পদ্ধতিতে ধান চাষ করার যে পদ্ধতিগুলো রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে সঠিক সেচ অবকাঠামোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় কৃষকরা এ পদ্ধতি অবলম্বন করে ধান চাষ করতে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। বাংলাদেশে নিবিড় পদ্ধতিতে ধান চাষের ওপর গবেষণায় আমরা দেখতে পেয়েছিলাম যে এ পদ্ধতিতে শ্রমিক কিছুটা বেশি লাগলেও উৎপাদন বেশ আশাব্যঞ্জক হারে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া মাঠকর্মের সময় দেখেছিলাম কৃষকরা নতুন টেকনোলজি বা পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হন। তারা তাদের কৃষিতে ফলন বৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি নিয়েও পরীক্ষামূলক কাজে যুক্ত হন। তারা নিজেরা নিজেদের পরিসরে আলাপ আলোচনা করেন, পরামর্শ করেন গ্রামীণ চা স্টলগুলোয় কিংবা গ্রামীণ মেঠো আড্ডায়। তারা তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা করেন, তবে অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় কৃষি তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে না। কিছু ক্ষেত্রে পৌঁছলেও নির্দিষ্ট পরিষেবা গ্রহণ করার প্রক্রিয়ায় তারা একীভূত হতে পারেন না। তাদের নিজেদের মধ্যে গ্রামীণ যোগাযোগ থাকলে কোনো একটা বিষয়ে যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, সেই জোরটুকু করে উঠতে পারেন না। এ বিষয়ে অনেকেই মতামত দেন যে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে কোনো সংগঠন গ্রাম পর্যায়ে নেই। আর রাজনৈতিক যে সংগঠনগুলো রয়েছে, সেগুলোও প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক কৃষকদের খুব কাজে আসে না। তাদের অনেকেই বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ সংগঠনের গ্রাম পর্যায়ের সমিতির সদস্য হয়ে অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হলেও কৃষিভিত্তিক কো-সাংগঠনিক জমায়েত নেই। প্রশিক্ষণের পরিপ্রেক্ষিত থেকে আলোচনার সময় তারা জানান, সরকারি-বেসরকারি কত রকমের সুবিধাই তো কৃষকদের জন্য আসে, সবকিছুর খবর তারা পান না। তারা আরো জানান, তারা একে অন্যের চাষ পদ্ধতি নিয়ে আলাপ করেন, কেউ নতুন কোনো জাত আবাদ করে ভালো ফলন পেলে তা নিয়ে অন্যরা আগ্রহী হন। নিজেদের মাঝে আলোচনার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন নতুন বীজ, সার, প্রযুক্তি উত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারেন কিন্তু এটার কোনো সমন্বিত রূপ নেই। ফলে গ্রামভিত্তিক কৃষক সংগঠন, যা মূলত কৃষি ও প্রান্তিক কৃষকের অধিকার নিয়ে কাজ করবে তার অভাব তারা অনুধাবন করেন।
 
সেই আলোচনার রেশ ধরেই গ্রামীণ প্রান্তিক কৃষক খানাগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এ খানাগুলোর কৃষি পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক একটা প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরভিত্তিক চুক্তি কিংবা বন্ধক নেয়া জমিতে অধিক ফসল ফলানো তাদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা তাদের আবাদি জমির সর্বাধিক ব্যবহার কীভাবে করতে পারেন সে বিষয়েও অনেক সজাগ। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা সুসংহত ও টেকসই করে গড়ে তুলতে যে ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হয়, তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
 
এ পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, গ্রামীণ প্রান্তিক কৃষকদের উন্নয়নে ডিজিটাল ফাইন্যান্স প্লাটফর্মসহ অন্য সব ভার্চুয়াল ও রিয়েল প্লাটফর্মকে যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থা সুসংহত করার সময় এসেছে। এই করোনা মহামারী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যায়, বিশেষ করে কৃষি ভর্তুকি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর জটিলতা। ফলে গ্রামীণ কৃষি সমাজ ও কৃষি পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে সামাজিক গবেষণা প্রয়োজন।
 
তানভীর শাতিল : উন্নয়ন গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দেশকণ্ঠ/আসো

  মন্তব্য করুন
AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।