• মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  নিউইয়র্ক সময়: ২০:১০    ঢাকা সময়: ০৬:১০

চট্টগ্রামের ওয়ার সেমেট্রি যেন এক খন্ড ভূ-স্বর্গ

 

রুবেল খান, চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিশাল মাঠ জুড়ে সবুজ ঘাস। সারি সারি পাথর। নানা রঙের ফুলের সমাহার। পুরো মাঠই যেন একটি নান্দনিক ফুলের বাগান। চারপাশ গোছানো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। দেখে বোঝার উপায় নেই, চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর যোদ্ধাদের সমাধিস্থল এটি। বড় আকারের সাদা ক্রুশ জানান দিচ্ছে সমাধিক্ষেত্রের পবিত্রতা। প্রতিটি সমাধির পাশে আছে ফুলের গাছ। কিছু গাছের ফুল ঝরে পড়েছে সমাধিতে। চট্টগ্রামের ওয়ার সেমেট্রি হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত এই সমাধিস্থল যেন এক খন্ড ভূ-স্বর্গ!

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পাহাড়ি রাস্তার কিছুটা ঢালু আর কিছুটা সমতল ভূমিতে গড়ে উঠেছে এই সমাধি। সম্পূর্ণ সমাধি এলাকার পরিবেশ একই সাথে মনোরম, গুরুগম্ভীর এবং শান্ত। সাত একর জায়গার ওপর গড়ে উঠা এই ওয়ার সিমেট্রির প্রবেশপথের মূল ফটক থেকে সামান্য পথ হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে লাল ইটের গাঁথুনির দুটি ছোট গির্জা ও মেটাল গেট।

 

হাতের ডান পাশে গির্জায় একটি মেমোরিয়াল বুক রাখা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয় বাণিজ্য তরীর প্রায় ছয় হাজার ৫০০ নাবিক ও লস্কর মারা যায়, যাদের লাশের হদিস মেলেনি কখনো। তাদের নাম ও পদবি এই মেমোরিয়াল বুকে সংরক্ষিত আছে।  

 

হাতের বাঁ পাশের গির্জায় রয়েছে সিমেট্রি রেজিস্ট্রার, যাতে লেখা রয়েছে সমাহিত সেনা সদস্যদের নাম  ও পদবী।তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। গেট থেকেই সমাধিস্থলের মাঝ বরাবর একটি অপূর্ব ক্রুশ চিহ্নিত বেদি চোখে পড়ে। তার পরই পূর্বদিকে আছে একটি প্রার্থনা কক্ষ।

 

ওয়ার সিমেট্রির বাইরে খোলা মাঠ এবং সুন্দর বাগান আছে। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এই সিমেট্রিতে চল্লিশ জাতের বৃক্ষরাজি রয়েছে। রয়েছে দেবদারু, গর্জন, মেহগনি, ইউক্যালিপটাস, পাম গাছ।

 

এছাড়া গন্ধরাজ, বেলী, পাতাবাহার, লেনথানা, গোলাপ, লেটারলিফসহ কয়েক শতাধিক দেশী-বিদেশী ফুল গাছ সমাধিতে এক অসাধারণ স্বর্গীয় মোহের সৃষ্টি করেছে। সমাধিস্থলে চোখে পড়বে অতি যত্নে সংরক্ষিত কবরের সারি। প্রতিটি কবরের গায়ে লেখা আছে শহীদদের নাম-পরিচয়। বিকেলে অনেক পর্যটক পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে সমাধি দেখতে আসেন।

 

কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি চট্টগ্রামের দামপাড়া এলাকায়, ১৯ নং বাদশা মিয়া সড়কে অবস্থিত। এটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ২২ কিমি উত্তরে অবস্থিত। ওয়ার সিমেট্রির প্রতিষ্ঠাকালে এই এলাকাটি একটি বিশাল ধানের ক্ষেত ছিল, যদিও বর্তমানে এটি বেশ উন্নত এলাকা এবং শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি প্রতিষ্ঠা করে। যুদ্ধ চলাকালীন সময় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং ১৫২ নং ব্রিটিশ জেনারেল হাসপাতালের সুবিধার কারণে চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র বাহিনী চতুর্দশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প স্থাপন করে। হাসপাতালটি ডিসেম্বর ১৯৪৪ থেকে অক্টোবর ১৯৪৫ পর্যন্ত সক্রিয় ছিলো।

 

সেই সময়ে এই ক্যাম্পে প্রচুর সৈন্যকে আহত অবস্থা থেকে সুস্থ করে দেশে পাঠানো হয়েছিল। আর যারা সেই জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তাদের সম্মানার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি দল এই সমাধিসৌধ প্রতিষ্ঠা করে।

 

প্রাথমিকভাবে এই সমাধিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ৪০০ মৃতদেহ সমাহিত করা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও যুদ্ধ শেষে অতিরিক্ত মৃতদেহ লুসাই, ঢাকা, খুলনা, যশোর, কক্সবাজার, ধোয়া পালং, দোহাজারি, রাঙ্গামাটি, পটিয়া এবং অন্যান্য অস্থায়ী সমাধিস্থান থেকে এই সমাধিস্থানে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে এখানে ৭৩১টি সমাধি বিদ্যমান, যার মধ্যে ১৭ জনের কোনো পরিচয় মেলেনি।

 

এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত জাতীয় বিদেশী সৈন্যদের মধ্যে (ওলন্দাজ এবং জাপানি সৈন্য) প্রায় ২০টি সমাধি বিদ্যমান। নাগরিকদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ৩৭৮ জন, কানাডার ২৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার নয় জন, নিউজিল্যান্ডের দুই জন, অবিভক্ত ভারতের (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০ জন, মিয়ানমারের দুই জন, নেদারল্যান্ডসের এক জন ও জাপানের ১৯ জন রয়েছেন।

 

পেশা অনুসারে এই সমাধিস্থলে সৈনিক ৫৪৩ জন, বৈমানিক ১৯৪ জন এবং নাবিক আছেন ১৪ জন। যুদ্ধকালীন সমাধি ছাড়াও বেসামরিক নাগরিকদের চারটি সমাধি এ কবরস্থানে রয়েছে। এছাড়া এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) চট্টগ্রাম-বোম্বের একটি স্মারক বিদ্যামান। পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে নির্মিত এ সিমেট্রির বাইরের অংশে খোলা মাঠ রয়েছে।

 

কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি কমিশনের বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ওয়ার সেমেট্রিতে প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্যে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত থাকে যা শীতকালীন ও রোজার সময় কিছুটা পরিবর্তন ঘটে থাকে।

 

দেশকণ্ঠ/এমআরকে

 

 

  মন্তব্য করুন
AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।