• মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  নিউইয়র্ক সময়: ২০:০৩    ঢাকা সময়: ০৬:০৩

রাস্তা প্রশস্তকরণের নামে জোরপূর্বক বসতভিটা-দোকানপাট দখলের অভিযোগ

  • মতামত       
  • ২১ নভেম্বর, ২০২১       
  • ১২

দেশকণ্ঠ প্রতিবেদন : গাজীপুর সিটি করপোরেশন সড়ক সংস্কার ও প্রশস্ত করতে গিয়ে বাসিন্দাদের বসতভিটা, দোকানপাটের জায়গা জোরপূর্বক দখল করে নিয়ে সড়ক প্রশস্ত করণের কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জমি অধিগ্রহণ আইন না মেনে জায়গার উপর থেকে স্থাপনা সরানোর জন্য নামমাত্র কিছু টাকা দিচ্ছেন গাজীপুর সিটি মেয়র অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম এবং তার অনুসারীরা। সরেজমিনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
 
গাজীপুর মহানগরের সালনা এলাকার বাসিন্দা সেতারা বেগম। তার স্বামী মোসলেম উদ্দিন গত বিশ বছর আগে সালনা থেকে মজলিশপুর রোডে ৪ কাঠা জমি ক্রয় করেন। জমি ক্রয়ের সময় বাড়িতে যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা ছিল না। তারা ৯ ফুট জায়গা রাস্তার জন্য ছেড়ে দিয়ে তিন তলা ফাউন্ডেশনের একটি ভবন এবং একটি আধা পাকা বাড়ির নির্মাণ করেন। গত শনিবার ১৩ নভেম্বর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম এবং তার অনুসারীরা সেতারা বেগমকে ৪০ ফুট রাস্তা প্রশস্তকরনের জন্য তার ১৪ ফুট জায়গা থেকে সকল প্রকার স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলেন। সেতারা বেগম ওই জায়গায় তিন তলা একটি ভবন এবং একটি আধা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। সড়কের জন্য ১৪ ফিট ছাড়তে হলে তাকে ওই ভবনের অর্ধেক অংশ এবং আধা পাকা বাড়ির দুটি কক্ষ ভাঙতে হয়।
 
আগামী সাত দিন তথা ২০ নভেম্বরের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। মেয়রের কাছে এ ব্যাপারে ক্ষতিপূরণ চাইলে মেয়র তাদেরকে জানান, কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে না। তবে ভবন ভাঙা এবং জায়গা খালি করার জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে তা তাদেরকে দেওয়া হবে। এর জন্য সাহায্য চেয়ে আবেদন করতে হবে। সেতারা বেগম ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার আশ্বাসে সাহায্য নেওয়ার জন্য কোনো আবেদন করেননি। তিনি বলেন, “একজন নাগরিক হয়ে সিটি কর্পোরেশনের সকল প্রকার কর দেওয়ার পরও বিনামূল্যে নিজের জমি রাস্তার জন্য ছেড়ে দেওয়া এক ধরনের জবরদখল। দেশের কোথাও এমনটি ঘটেছে বলে জানা নেই। জাহাঙ্গীর আলম সিটি করপোরেশনের একজন মেয়র হয়ে নাগরিকদের প্রতি জুলুম করছেন।”
 
গাজীপুর মহানগরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড সালনা এলাকার অপর এক বাসিন্দা আলী আজগর। তিনি জানান, চাকুরী জীবনের সকল উপার্জন দিয়ে সালনা কনকর্ড কারখানা থেকে মজলিশপুর রোডের পাশে দেড় শতক জমি ক্রয় করেন। তখন রাস্তাটি ছিল ৮ ফুট প্রশস্ত। বর্তমানে সিটি করপোরেশন এর রাস্তা ৪০ ফুট প্রশস্ত করে সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে তার পৌনে ১ শতাংশ জায়গা রাস্তার মধ্যে চলে যায়। সিটি করপোরেশন থেকে ওই পৌনে ১ শতাংশ জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। এতে তার সারা জীবনের ঠিকানা হারিয়ে যাবে। তিনি আরও জানান, এ সড়কে তার মত অনেক মানুষ এরকম নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কা করছেন। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তাদের এসব জমি নেওয়ার জন্য কোনো প্রকার অধিগ্রহণ অথবা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন না। নিজের স্থাপনা নিজেই ভেঙে দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে শুধুমাত্র ভাঙ্গার খরচটি দেওয়া হচ্ছে। সড়কের জন্য রাস্তা ছেড়ে না দেওয়া হলে বলপূর্বক জমি দখলে নেওয়া হচ্ছে, ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে স্থাপনা। মেয়রের কাছে কোনো প্রকার আবেদন-নিবেদন করেও কাজ হচ্ছে না।
 
বসুগাঁও এলাকার বাসিন্দা এম এ জিন্নাহ জানান, ১৮ বছর প্রবাসে থেকে শরীরের ঘাম পানি করে তিনি অর্থ উপার্জন করেছেন। ওই অর্থে বসুগাঁও এলাকায় সামান্য জমি কিনে আড়াই যুগের বেশি সময় ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন। বসুগাঁও বাজার থেকে ভাণ্ডারী বাজার সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে। সড়কটি আগে ছিল ৮ ফুট প্রশস্ত। এখন তার প্রশস্ততা বাড়িয়ে কোথাও ৩০ ফুট আবার কোথাও ৪০ ফুট করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সড়কের জন্য জায়গা খালি করে দিতে বলছে মহানগরের কর্মকর্তারা। তার নিজ নামে জমি-জমার বন্দোবস্তসহ সকল প্রকার দলিল দস্তাবেজ বৈধ থাকার পরও জমি অধিগ্রহণ বা ক্ষতিপূরণ প্রদানের কোনো আশ্বাস দিচ্ছে না খোদ মহানগর কর্তৃপক্ষ।
 
তিনি জানান, তার ৯৬০ ফুট জায়গা সড়কের জন্য খালি করে দিতে হয়েছে। সড়কের পাশে দোকানপাট ও স্থাপনা ভাঙতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যথায় মহানগরের কর্মকর্তারা বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা ভেঙ্গে জায়গা খালি করছে। ক্ষতিপূরণতো দূরের কথা, স্থাপনা ভাঙ্গা বা সরানোর যে খরচ সেই খরচও দিচ্ছে না মহানগর কর্তৃপক্ষ। তার বসতঘরের ৪টি কক্ষ, একটি দোকান ও সাবমার্সিবল পানির পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানপাট, বসতঘরের স্থাপনা ও জমিসহ তার মোট এক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন।
 
বসুগাঁও গ্রামের মতিউল্লাহর স্ত্রী শিরীন আক্তার জানান, তার দুটি স্থানে সাড়ে ৬ কাঠা জায়গা সড়কে চলে যাচ্ছে। ক্ষতিপূরণতো দূরের কথা নিজেরাই জায়গা খালি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যথায় মহানগর কর্তৃপক্ষের লোকজন এসে স্থাপনা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ভাঙবে বলে জানিয়ে গেছেন। এলাকায় প্রতি কাঠার মূল্য ১২ লাখ টাকা। সকল জায়গার খাজনা-খারিজ পরিশোধ। তারপরও নিজের জায়গা সড়কের জন্য কোনো অধিগ্রহণ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়ে যাচ্ছে গাজীপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ। এদিকে ১৯ নভেম্বর বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
 
জহিরুল হক ভুঁইয়ার ছেলে তানভীর ভূঁইয়া জানান, তার বসতবাড়ির মোট জায়গা পৌনে ২ কাঠা, এর মধ্যে এক কাঠা সড়কের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। এখন তিনি স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে কোথায় থাকবেন কোথায় উঠবেন তা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। তার মতো অনেকেই রয়েছেন, যাদের বসতবাড়ি সড়কে চলে যাচ্ছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিনি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে জায়গার সমাধানের দাবী জানান। বসুগাঁও গ্রামের মৃত বশির উদ্দিনের ছেলে এজাহার হোসেন জানান, তালুটিয়া মৌজায় ৪টি বসতঘর সড়ক প্রশস্ত করণের জন্য ভেঙ্গে ফেলতে হয়েছে। সকল প্রকার বৈধ কাগজপত্র ও জমিতে বসবাস করার পরও কোনো বিনিময় ছাড়াই গাজীপুর মহানগর কর্তৃপক্ষের কাছে জমি ছেড়ে দিতে হয়েছে।
 
শাহ আলমের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, “আমার শ্বশুর মৃত হাছেন আলীর নামে জমি-জমার বৈধ কাগজপত্র ও তার সন্তানেরা বৈধ উত্তরাধিকার হওয়ার পরও সিটি করপোরেশন রাস্তার নামে জোরপূর্বক তিন কাঠা জমি দখলে নিয়ে গেছে। জমি অধিগ্রহণ বা এ সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি।” একই গ্রামের আবুল কাশেম গাজী বলেন, “আমার জমির ওপর দিয়ে নতুন ঢাকা-চট্টগ্রাম নতুন রেললাইন স্থাপন হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বাজার মূল্যের চেয়েও বেশি মূল্য দিয়েছে। এমনকি জমিতে কোনো প্রকার ফলজ বা বনজ গাছপালা থাকলে সেগুলোরও বাজারমূল্যে তা পরিশোধ করেছে। কিন্তু গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ৮ ফুট রাস্তার জায়গায় এখন ৩০ বা কোনো জায়গায় ৪০ ফুট প্রশস্ত করে সড়ক সংস্কার করছে। কিন্তু অধিগ্রহণ নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা করছে না।”
 
একই গ্রামের মৃত আলাল উদ্দিনের ছেলে আব্দুর রহমান বলেন, “এক বছর হয়নি বাড়ি নির্মাণ করেছি। সড়ক সংস্কারের কথা বলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা এসে ৮ ফুটের রাস্তা ৪০ ফুট করার কথা বলে বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। অন্যথায় তা ভেঙ্গে সড়ক প্রশস্ত করণের কাজ করবে বলে জানিয়ে গেছে। আমার বাড়ির আশপাশে খালি জমি রয়েছে, সেগুলোর ওপর দিয়ে সড়ক ঘুরিয়ে নেয়ার কথা বললেও তারা মানেনই। বাড়ি ভেঙ্গেই তাদেরকে সড়কের জায়গা দিতে হবে বলে শাসিয়ে গেছে।” প্রচণ্ড ক্ষোভে তিনি প্রশ্ন ছোঁড়ে দিয়ে বলেন “জমি অধিগ্রহণ আইন কার জন্য, কাদের জন্য? আমরা বিনামূল্যে বাপ-দাদার বৈধ জমি কেন সিটি করপোরেশনকে দিব?” গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আকবর আলী জানান, এসব ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণ ধরা হয়নি।
 
এ বিষয়ে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান জানিয়েছিলেন, শুক্রবার বিকেলে দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে দলের সভানেত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাজীপুরের মেয়র জাহাংগীর আলমকে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে আজীবন বহিষ্কারের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। এরপর ২০ নভেম্বর নগরবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজ বাসভবনে অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আমি নগরবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য এখানে দাঁড়িয়েছি। আমি রাস্তা করার জন্য আট হাজার বিঘা জায়গা নগরবাসীর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি। ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রায় সমাপ্তির পথে। ৩২ হাজার বাড়ি-ঘর ও দোকানপাট আপনারা নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিয়েছিলেন। সেজন্য আমি নগরবাসীর কাছে ক্ষমা চাই। এ রাস্তাগুলো আমার ব্যবহারের জন্য নয়।”
দেশকণ্ঠ/অআ

  মন্তব্য করুন
AD by Deshkontho
AD by Deshkontho
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা: ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।