নিউটার্ন ধর্ম ডেস্ক : মানুষের জীবন নানা ধরনের বিপদ-আপদ, অসুস্থতা, ভয় ও দুশ্চিন্তায় পরিপূর্ণ। এসব পরিস্থিতিতে মানুষ স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সুস্থতার আশায় মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।
কেউ কোরআন তিলাওয়াত করেন, কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও জিকির পাঠ করেন, আবার কেউ কোরআনের আয়াত ও মাসনুন দোয়াসংবলিত তাবিজ ব্যবহার করেন।
ইসলাম মানুষকে সব ধরনের শিরক, কুসংস্কার ও অবৈধ উপায় থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর কালাম, তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়ার মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনারও নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত। ’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৮২)
তাবিজ এবং এর প্রকারভেদ
সাধারণত কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, হাদিসে বর্ণিত দোয়া কিংবা অর্থবোধক কোনো প্রার্থনা লিখে কাগজ বা অন্য কোনো উপকরণে সংরক্ষণ করে শরীরে ধারণ করাকে তাবিজ ব্যবহার বলা হয়। তবে তাবিজের বিষয়বস্তু ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য অনুসারে এর বিধান ভিন্ন হতে পারে। যেমন-
প্রথমত, কোরআন ও বিশুদ্ধ দোয়াসংবলিত তাবিজ। এতে কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম কিংবা অর্থবোধক ও শরিয়তসম্মত দোয়া লেখা থাকে।
এ ধরনের তাবিজ ব্যবহার জায়েজ।
দ্বিতীয়ত, অজ্ঞাত শব্দ ও দুর্বোধ্য চিহ্নসংবলিত তাবিজ। এতে এমন শব্দ, সংখ্যা, সাংকেতিক চিহ্ন বা মন্ত্র থাকতে পারে, যার অর্থ ও উদ্দেশ্য জানা যায় না। এগুলোর মধ্যে শিরক, প্রতারণা ও কুসংস্কারের আশঙ্কা থাকায় এ ধরনের তাবিজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
তৃতীয়ত, শিরকি ও কুফরি বক্তব্যসংবলিত তাবিজ।
এতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে ইবাদতসুলভ প্রার্থনা, শিরকি আহ্বান কিংবা ইসলামের মৌলিক আকিদাবিরোধী বক্তব্য থাকলে তা ব্যবহার করা বৈধ নয়।
এক হাদিসে হজরত আউফ ইবনে মালিক আল-আশজায়ি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহেলি যুগে আমরা ঝাড়ফুঁক করতাম। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের ঝাড়ফুঁকের পদ্ধতিগুলো আমার সামনে উপস্থাপন করো। ঝাড়ফুঁকে শিরক না থাকলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২০০)
এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, শিরকমুক্ত রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক বৈধ। কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও অর্থবোধক বৈধ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করা যায়।
তবে মনে রাখা জরুরি—রুকইয়াহর বৈধতা প্রমাণিত হওয়া মানেই লিখিত তাবিজের সব পদ্ধতি বৈধ হয়ে যাওয়া নয়। কারণ রুকইয়াহর মাধ্যমে দোয়া পাঠ করা এবং দোয়া লিখে শরীরে ঝুলিয়ে রাখার মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। লিখিত তাবিজের বিধান নির্ধারণে এ হাদিসের পাশাপাশি অন্যান্য বর্ণনা ও ফিকহবিদদের ব্যাখ্যাও বিবেচনা করতে হয়।
সুনানে আবু দাউদে আমর ইবনে শুআইব (রহ.) থেকে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে একটি বর্ণনা এসেছে। এতে উল্লেখ রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ভীতিকর পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার একটি দোয়া শিক্ষা দিতেন। দোয়াটি হলো, ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে তাঁর ক্রোধ, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট, শয়তানদের কুমন্ত্রণা এবং তাদের আমার কাছে উপস্থিত হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ হাদিসের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) তাঁর যেসব সন্তান দোয়াটি বুঝতে পারত, তাদের তা শেখাতেন। আর যারা তা বুঝতে পারত না, তাদের জন্য দোয়াটি লিখে ঝুলিয়ে দিতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৯৩)
ফিকহের কিছু নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে নির্দিষ্ট শর্তে এ ধরনের তাবিজ ব্যবহারের অনুমতি উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘তাবিজে কোরআন অথবা মহান আল্লাহর নাম লেখা থাকলে তাতে অসুবিধা নেই। (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫২৩)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে বলেন, ‘আলেমদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাবিজের বৈধতার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
১. আল্লাহর বাণী, তাঁর নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে হতে হবে।
২. তা আরবি ভাষায় অথবা অন্য এমন ভাষায় হতে হবে, যার অর্থ জানা যায়।
৩. বিশ্বাস রাখতে হবে, রুকইয়াহ নিজস্ব স্বাধীন ক্ষমতায় প্রভাব সৃষ্টি করে না; বরং আল্লাহর ইচ্ছাতেই ফলাফল ঘটে।’ (ফাতহুল বারি, ১০/৪২০)
এসব আমল মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল থাকতে সহায়তা করে। বিশেষ করে সরাসরি দোয়া ও রুকইয়াহর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এমন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি, যার বৈধতা নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
নিউটার্ন/এআর