দেশকন্ঠ অনলাইন : উপকূলীয় এলাকায় তাণ্ডবলীলা চালিয়ে চীনের পূর্বাঞ্চলে আছড়ে পড়েছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ডলফিন’। প্রাকৃতিক এই দুযোর্গের প্রভাবে বাণিজ্য নগরী সাংহাইসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে অন্তত ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হংকং সময় রবিবার (৯ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার (৯৪ মাইল) বাতাসের গতিবেগ নিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি প্রথমে জিয়াং প্রদেশের ইউহুয়ানে আঘাত হানে। এর ঠিক এক ঘণ্টা পর এটি ওয়েনঝৌ শহরে দ্বিতীয়বার আঘাত হানে। ঝড়টির প্রভাবে পুরো অঞ্চলজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। কেবল সাংহাইতেই ১,৪০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
ঝড়টি উপকূলে পৌঁছানোর আগে সর্বোচ্চ ‘লাল সতর্কতা’ জারি করা হয়েছিল। তবে সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে এর তীব্রতা কমে ক্রান্তীয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ে রূপ নেওয়ায় সতর্কতা সংকেত কমিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এটি চীনের মূল ভূখণ্ডের ভেতরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আগামী বুধবার (১২ আগস্ট) পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত, ভয়াবহ বন্যা এবং ভূমিধসের তীব্র ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে আবহাওয়া বিভাগ।
সোমবার দেশটির শানডং, হেনান, হুবেই, আনহুই, জিয়াংসু, চচিয়াং প্রদেশ এবং সাংহাই শহরের বিভিন্ন এলাকায় অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে কয়েক দিন চচিয়াং প্রদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে ২৫০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে।
দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সাংহাইয়ের পর্যটন কেন্দ্র ‘দ্য বুন্ড’-এর ভিউয়িং প্ল্যাটফর্ম, ডিজনিল্যান্ড ও লেগোল্যান্ডের কিছু অংশসহ জনপ্রিয় কয়েকটি পর্যটন স্থান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, সাংহাইয়ের জনপ্রিয় ফ্রেঞ্চ কনসেশন এলাকার বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলা প্লাবিত হয়েছে এবং মানুষজনকে হাঁটু পানিতে চলাফেরা করতে হচ্ছে।
ঝড়ের প্রভাবে চচিয়াং প্রদেশের ওয়েনঝৌ শহরে প্রায় ৯ লাখ বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এক হাজারটিরও বেশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এছাড়া তাইঝৌ শহর থেকে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বন্যা ও ঝোড়ো হাওয়ার মুখে চালকদের গাড়ি নিরাপদে রাখার সুবিধার্থে চচিয়াং প্রদেশের রাজধানী হাংঝৌতে পাবলিক পার্কিং ফি মওকুফ করেছে প্রশাসন। অন্যদিকে, উপকূলীয় প্রদেশ ফুজিয়ানে ডজনখানেক ফেরি চলাচল বন্ধের পাশাপাশি ১০০টিরও বেশি অফশোর নির্মাণকাজ স্থগিত করা হয়েছে।
এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রাণহানির খবর না পাওয়া গেলেও, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে- চচিয়াংয়ের ওয়েনলিং এলাকা থেকে ৯ বছরের এক শিশু ঢেউয়ের টানে সমুদ্রে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে আছড়ে পড়ার আগে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে, যা সাধারণ যেকোনো ঘূর্ণিঝড়ের গড় আয়ুষ্কালের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। চীনে আঘাত হানার আগে ঝড়টি ফিলিপাইন, তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চল ও জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপেও প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছে।
এদিকে, ঝড়টিকে কেন্দ্র করে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া গুজবের বিরুদ্ধেও শক্ত অবস্থান নিয়েছে দেশটির পুলিশ। বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ঝড়ের সময় সাংহাইয়ের একটি ভবন থেকে মানুষের নিচে পড়ে যাওয়ার কৃত্রিম বা এআই-জেনারেটেড ভুয়া ভিডিও তৈরি করেছিলেন। অপর আটককৃত ৩২ বছর বয়সী যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও ভুলভাবে এডিট করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিলেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
দেশকন্ঠ/এআর