►দর্পণ কবীর, নিউ ইর্য়ক
এবারই প্রথম এমন নয়। সেই ১৯৮৬ সালেও একবার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। পেয়েছে আবারও। এরই মধ্যে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক নতুন ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাল। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে বসতে যাওয়া বৈশ্বিক এই মহাসম্মেলন পরিচালনা করবেন লাল-সবুজের প্রতিনিধি।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছর ২ জুন অনুষ্ঠিত বৈঠকে গোপন ভোটাভুটিতে জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯টি দেশের সমর্থন নিয়ে ড. খলিলুর রহমান এই মর্যাদাপূর্ণ পদে জয়লাভ করেন। যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস লাভ পেয়েছিলেন ৯১টি ভোট।
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায় যে এটি বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো এক অসামান্য প্রাপ্তি। আজ থেকে ঠিক চার দশক আগে ১৯৮৬ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে তৎকালীন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী প্রথম বাঙালি হিসেবে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের বিরতি এবং ২০২০ সাল থেকে নেওয়া সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ড. খলিলুর রহমানের এই জয় আবারও প্রমাণ করল বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা কতটা সুদৃঢ়।
জাতিসংঘের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রধান নির্বাহী সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস হলেও সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি নীতি নির্ধারণ ও বৈশ্বিক ঐকমত্য গঠনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। সভাপতি হিসেবে মূল দায়িত্ব হলো ১৯০টিরও বেশি সদস্য দেশের আস্থাকে এক সুতোয় গেঁথে অধিবেশনের প্রায় ১৬৫টি এজেন্ডার ওপর নিরপেক্ষভাবে আলোচনা পরিচালনা করা ও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। বিশেষ করে যখন নিরাপত্তা পরিষদ কোনো বৈশ্বিক সংকটে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ পরিষদের সভাপতির নেতৃত্বেই বিকল্প সমাধান বা প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এছাড়া জাতিসংঘের পিস কিপিং ফান্ড ও সংস্থার অধীনে থাকা ছয়টি প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক বাজেট চালনায় সভাপতির প্রত্যক্ষ ও বাধ্যতামূলক ভূমিকা থাকে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতি পদের প্রার্থিতার সময় ড. খলিলুর রহমান যে রূপকল্প বা ভিশন স্টেটমেন্ট পেশ করেছিলেন, তা বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি শান্তি, নিরাপত্তা, সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গতি ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্র প্রসারিত করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তির সুশৃঙ্খল ব্যবহারের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বিশ্বে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় বিশেষ নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এই বিশ্বজয়ের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।