দেশকন্ঠ অনলাইন : সুস্থতা মানুষের জীবনের অন্যতম বড় নিয়ামত। অথচ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং অসচেতন খাদ্যাভ্যাসের কারণে নানা স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। আধুনিক জীবনে শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তা তাই নতুন করে আলোচনায় আসছে। ইসলামের দৃষ্টিতে শরীরের যত্ন নেওয়া দায়িত্বশীল জীবনযাপনের অংশ। শরীরচর্চা সুস্থতা রক্ষা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শরীর আল্লাহর আমানত ও সুস্থতা বড় নিয়ামত
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের শরীর আল্লাহ প্রদত্ত আমানত।
এই শরীরকে সুস্থ রাখা, ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং যথাযথ কাজে ব্যবহার করা মানুষের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)
আয়াতটি মূলত আল্লাহর পথে ব্যয় ও দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হলেও এর মধ্যে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)।
হাদিসটি মানুষের জীবনে ভারসাম্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। ইবাদত, পড়াশোনা, কাজ কিংবা অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজন পূরণ করাও জরুরি। শরীরকে অবহেলা করে এমন জীবনযাপন করা উচিত নয়, যা মানুষকে অক্ষমতা ও অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তিনি হাঁটাহাঁটি করতেন, সফর করতেন, ঘোড়ায় চড়তেন, দৌড়াতেন। সাহাবিরাও নবীজির অনুসরণে শরীরচর্চা করতেন।
শরীরচর্চা শরীরের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে, পেশি ও হাড়ের সক্ষমতা বাড়াতে এবং দৈনন্দিন কাজে সক্রিয় থাকতে সহায়তা করে। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম করার মাধ্যমে অলসতা কমানো যায়। অসুস্থ ব্যক্তি বা বিশেষ শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।
কর্মক্ষম মুমিনের মর্যাদা ও শরীরচর্চার গুরুত্ব
ইসলাম শুধু সুস্থ থাকার প্রতি উৎসাহ দেয় না; বরং কল্যাণকর কাজে সক্ষমতা অর্জনের প্রতিও গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
এখানে শক্তি বলতে শুধু শারীরিক শক্তি নয়; ঈমান, সংকল্প ও কল্যাণকর কাজে সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত। তবে শারীরিক সক্ষমতা যে একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
শরীরচর্চা মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নিয়মিত কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে। একজন সুস্থ মানুষ নামাজ, রোজা, হজসহ বিভিন্ন ইবাদত পালনে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হতে পারেন। একইভাবে জীবিকা অর্জন, পরিবার প্রতিপালন, মানুষের সেবা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সুস্থ শরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের জীবনে শারীরিক সক্ষমতা অর্জন, দৌড় প্রতিযোগিতা এবং উপকারী খেলাধুলার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। একবার তিনি নবীজি (সা.)-কে অতিক্রম করেন; পরে অন্য একসময়ে নবীজি (সা.) তাঁকে অতিক্রম করেন। তখন তিনি বলেন, ‘এটি সেইবারের বদলা।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭৮)
এ ঘটনা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আনন্দের পাশাপাশি বৈধ বিনোদন ও শারীরিক সক্রিয়তার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।
শরীরচর্চায় ইসলামের নির্দেশনা ও আমাদের করণীয়
শরীরচর্চাকে কার্যকর করতে হলে নিয়মিত জীবনযাপনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা, হালকা ব্যায়াম কিংবা পছন্দের কোনো উপকারী হালাল খেলাধুলার জন্য সময় রাখা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করাও সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইসলাম খাবার গ্রহণেও সংযমের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৩১)
অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতি এবং দৈনন্দিন কাজে সক্রিয়তা বজায় রাখা প্রয়োজন। শরীরচর্চার ক্ষেত্রেও নিজের বয়স ও শারীরিক সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ রাখা উচিত। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শরীরচর্চার ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক নিরাপদ, শালীন ও উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
দেশকন্ঠ/এআর