• মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১  নিউইয়র্ক সময়: ১৭:৪৭    ঢাকা সময়: ০৩:৪৭

রাসেলস ভাইপার: আতঙ্ক নয় জানতে হবে

  • মতামত       
  • ২৭ জুন, ২০২৪       
  • ২৪
  •       
  • ২৩:০৮:০৪

ডা. এম এইচ ফারুকী, দেশকন্ঠ অনলাইন : বাংলাদেশে জীববিজ্ঞানীদের কাছে রাসেলস ভাইপার একটি বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সাপের বৃদ্ধি এই অঞ্চলের মানব জীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সারা দেশে অন্তত ২৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের দেখা মিলেছে। মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরের মতো এলাকাসহ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর অববাহিকায় এই সাপের বিস্তার দেখা গেছে। সাধারণ জনগণ যেখানেই এই সাপ দেখা যাচ্ছে, সেখানেই পিটিয়ে মেরে ফেলছে।

চলতি বছরে রাসেলস ভাইপারের দংশনে ১০ থেকে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ সালের মধ্যে রাসেলস ভাইপার সাপের দংশন  নিয়ে কমপক্ষে ২০২ রোগী এসেছিলেন, অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন নেওয়া সত্ত্বেও ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে কমপক্ষে সাত জন মারা গেছেন।  

স্থানীয়ভাবে চন্দ্রবোড়া বা উলুবোরা নামে পরিচিত রাসেলস ভাইপার বিশ্বের বিষাক্ত সাপগুলোর মধ্যে একটি। শরীরের বিভিন্ন স্থানে চাঁদের মতো ছোপ ছোপ গোল দাগের কারণে এদের নাম চন্দ্রবোড়া হতে পারে। পরিত্যক্ত উইঢিবি এদের অন্যতম আবাসস্থল হওয়ায় অনেকের মতে এদের আরেক নাম উলুবোড়া।

রাসেলস ভাইপার সাপ দেখতে অনেকটা ছোট অজগরের মত, সরু লেজ বিশিষ্ট এবং সাধারণত তিন থেকে পাঁচ ফুট দীর্ঘ হয়ে থাকে। সাপের মাথা চ্যাপ্টা, ত্রিভুজাকার এবং ঘাড় থেকে আলাদা, সারা শরীরে চাঁদের মতো গাঢ় বাদামি অনিয়মিত দাগ দিয়ে সজ্জিত। এই বৈশিষ্ট্যগুলো এটিকে শুষ্ক পাতা বা ধান ক্ষেতে সহজেই ছদ্মবেশ ধরে থাকতে সক্ষম করে। এই ধরনের সাপের চোয়ালের চলমান অংশের সঙ্গে এক জোড়া লম্বা বিষদাঁত যুক্ত থাকে, যা মুখের মধ্যে আবার ভাঁজ করে রাখতে পারে। এ বিষদাঁত দিয়ে সে শিকারের দেহের গভীরে বিষ প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়।

বেশির ভাগ সাপ ডিম পাড়ে, কিন্তু রাসেলস ভাইপার বাচ্চা জন্ম দেয়। একটি স্ত্রী ভাইপার সাধারণত ২০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করে, কখনও কখনও সংখ্যাটি আশি পর্যন্ত হতে পারে। স্ত্রী সাপ ছয় মাস গর্ভধারণের পর বাচ্চা প্রসব করে। সদ্যোজাত বাচ্চাগুলোর দৈর্ঘ্য সাধারণত ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি হয়। অল্পবয়সী চন্দ্রবোড়া সাপের মধ্যে স্বজাতি ভক্ষণের প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থাৎ মাঝে মাঝে তারা নিজেদের ভাইবোনকেও খেয়ে ফেলে।

প্রকৃতিগতভাবে রাসেলস ভাইপার সাপ অলস প্রাণী এবং একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে ঠেলে না দিলে এরা ধীরে ধীরে চলাচল করে। সাধারণত বেশির ভাগ সাপ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে, কিন্তু রাসেলস ভাইপার হুমকি বোধ করলে আক্রমণ করে। তারা অবিশ্বাস্য গতিতে আঘাত করে, পুরো প্রক্রিয়াটি সেকেন্ডের মাত্র ষোল ভাগের মধ্যে সম্পন্ন করে। আক্রমণের পূর্বমুহূর্তে তারা একটি এস-আকৃতির লুপ তৈরি করে, যা শরীরের উপরের এক-তৃতীয়াংশকে উত্থিত করে এবং শিকারিদের ভয় দেখানোর জন্য প্রেসার কুকারের মতো একটি জোরে হিসিং শব্দ উৎপন্ন করে।

এই ধরনের সাপ কোন একটি নির্দিষ্ট আবাসস্থলে সীমাবদ্ধ থাকে না, তবে ঘন বন এড়াতে দেখা যায়। সাপটি সাধারণত খোলা ঘাসযুক্ত এলাকায় পাওয়া যায় এবং ঝোপঝাড়, গাছপালা ও কৃষি জমিতে দেখা যায়। বর্তমানে পতিত জমি এবং ঝোপ খুব সীমিত হওয়ায় এই সাপ ফসলের ক্ষেতেই আশ্রয় নিচ্ছে। বাংলাদেশে রাসেলস ভাইপারের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ বলা খুব কঠিন, তবে নিম্নলিখিতগুলো সম্ভাব্য কারণ হতে পারে:  

বর্তমানে দেশের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র একেবারেই ভেঙে পড়েছে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে সমস্ত জীব তাদের অস্তিত্বের জন্য পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখে। সামান্য পরিবর্তন এই ভারসাম্য ব্যাহত বা বিপর্যস্ত করে এবং জীবন্ত প্রাণীদের মধ্যে বিরূপ ফলাফল আনে। বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়লে হঠাৎ কোনো প্রাণীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যেতে পারে। বনবিড়াল, খেঁকশিয়াল, দাঁড়াশ, গোখরাসহ কিছু শিকারি জীব মেঠো ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করত।

অন্যদিকে গুঁইসাপ, বেজি, তিলা নাগঈগল, কালকেউটে, শঙ্খিনী ও হুতুম প্যাঁচার প্রিয় খাদ্য চন্দ্রবোড়ার বাচ্চা। দেশের মানুষ বরাবরই বন্যপ্রাণীদের নিছক উপদ্রব মনে করে থাকে। মানুষের নির্মমতায় বন্যপ্রাণীগুলো একে একে প্রকৃতির কোল থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন চন্দ্রবোড়ার প্রায় প্রতিটি বাচ্চা অনেকটা নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠছে। দিন দিন বাড়ছে ওদের সংখ্যা।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত কৃষকরা সাধারণত বছরে একটি বা দুটি ফসল চাষ করত এবং ফসল চাষের জন্য পানির স্বল্পতার কারণে বছরের বাকি সময় জমি পতিত থাকত।  নব্বই এর দশকের পরপরই সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অল্প জমি পতিত থাকার কারণে কৃষকরা বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল চাষ করছেন। যেহেতু ফসল সারা বছরই কমবেশি পাওয়া যায় সেহেতু রাসেলস ভাইপারের প্রধান খাদ্য ইঁদুর ফসলের ক্ষেতেই পাওয়া যায়। এতে রাসেলস ভাইপার জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রজননের সুযোগ পায়।

রাসেলস ভাইপার সাপের বিষ হেমাটোটক্সিক, যা শরীরের রক্ত নষ্ট করে। এর তীব্র প্রভাবে ছোবলের স্থানের আশপাশে ফোসকা পড়ে এবং মাংস পচে যায়। এতে করে সুস্থ হওয়ার পরও অনেকের অঙ্গহানি ঘটতে দেখা যায়। কামড়ের ফলে আক্রান্ত স্থান তাৎক্ষণিকভাবে ফুলে যায় এবং বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গের কারণ হতে পারে, যার মধ্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ হারানো, ক্রমাগত রক্তপাত, রক্ত জমাট বাঁধা, স্নায়ুর ক্ষতি, পক্ষাঘাত এবং কিডনির ক্ষতি অন্যতম।

রাসেলস ভাইপার সাপের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভেনম সিরাম, অর্থাৎ এককভাবে এর বিষ বিনষ্টকারী ‘মনোভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম’ দেশে নেই। বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় ভারত থেকে আমদানিকৃত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যা গোখরা, কেউটে এবং চন্দ্রবোড়া, এই তিন সাপের বিষ প্রতিরোধে কাজ করে থাকে। রাসেলস ভাইপার সাপের দংশনে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ডোজ পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির অনেক সময় ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি আইসিইউতে রোগীকে ভর্তি করাতে হতে পারে। সাপে কাটার পরে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসায় বিলম্ব মারাত্মক পরিণতির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে রাসেলস ভাইপারের অবস্থান এবং এই সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা জানা এবং অনেকাংশেই অজানা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সচেতনতামূলক কর্মসূচির ফলে সাপের কামড় সম্পর্কে কৃষকদের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ফলে সাপের কামড়ে মানুষের ভয় ও মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে এবং তারা ফসলের ক্ষেতে সাবধানতার সঙ্গে কাজ করতে শিখছে। ফসল তোলার আগে সাপ তাড়ানোর জন্য ৩-৪ মিটার লম্বা হালকা বাঁশ দিয়ে ধান গাছে মৃদু নাড়াচাড়া (যাতে গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়) ব্যবহার করে থাকে। তারপরও  গ্রামীণ এলাকায় এখনও ঐতিহ্যগত বিশ্বাস ও কুসংস্কার বিরাজ করে, যার ফলে সঠিক চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয়।

রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাটা সবচেয়ে জরুরি। কৃষিজমিতে কাজের সময় অবশ্যই গামবুট পরতে হবে। সম্ভব হলে হাতে গ্লাভস পরতে হবে। রাসেলস ভাইপার সাপ হাত এবং পায়ে দংশন করে সবচেয়ে বেশি। সাপে কাটার পরে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে, যাতে এই সাপের দংশনে  আর কোনো মৃত্যু না হয়। জরুরি ভিত্তিতে পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে বিষধর সাপ থেকে নেওয়া বিষ ব্যবহার করে নিজস্ব অ্যান্টিভেনম তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

সবশেষ কথা হলো, বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে বন্যপ্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সাপ দেখলেই পিটিয়ে মারা যাবে না। মানুষ ও বন্যপ্রাণীদের সহাবস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, অকুপেশনাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল হেলথ্, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স
দেশকন্ঠ//

  মন্তব্য করুন
আরও সংবাদ
×

আমাদের কথা

ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী অনলাইন মিডিয়া। গতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষও তথ্যানুসন্ধানে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন। যতই দিন যাচ্ছে, অনলাইন মিডিয়ার সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক তত নিবিড় হচ্ছে। দেশ, রাষ্ট্র, সীমান্ত, স্থল-জল, আকাশপথ ছাড়িয়ে যেকোনো স্থান থেকে ‘অনলাইন মিডিয়া’ এখন আর আলাদা কিছু নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই ঘটুক, তা আর অজানা থাকছে না। বলা যায় অনলাইন নেটওয়ার্ক এক অবিচ্ছিন্ন মিডিয়া ভুবন গড়ে তুলে এগিয়ে নিচ্ছে মানব সভ্যতার জয়যাত্রাকে। আমরা সেই পথের সারথি হতে চাই। ‘দেশকণ্ঠ’ সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্বকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে বদ্ধপরির। আমাদের সংবাদের প্রধান ফোকাস পয়েন্ট সারাবিশ্বের বাঙালির যাপিত জীবনের চালচিত্র। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংবাদও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একঝাক ঋদ্ধ মিডিয়া প্রতিনিধি যুক্ত থাকছি দেশকণ্ঠের সঙ্গে।